প্রধানমন্ত্রীরদপ্তর
পশ্চিম এশিয়ায় চলতি সংঘর্ষের বিষয়ে লোকসভায় ভাষণ প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর
প্রকাশিত:
23 MAR 2026 3:47PM by PIB Kolkata
নয়াদিল্লি, ২৩ মার্চ, ২০২৬
প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী আজ লোকসভায় পশ্চিম এশিয়ায় চলতি সংঘাত এবং এর জেরে ভারতের সামনে এসে পড়া কঠিন নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিবৃতি দেন। এই সংকট তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে অব্যাহত রয়েছে এবং এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতি ও মানুষের জীবনের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে — একথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত সমস্যার সমাধানের ওপর জোর দেন। শ্রী মোদী বলেন, বিশ্বের সব দেশ, বিবাদে জড়িয়ে পড়া প্রতিটি পক্ষের কাছে এই সঙ্কটের দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, এই যুদ্ধ অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে যে জটিলতা তৈরি করেছে তা নজিরবিহীন। তিনি বলেন যে, যুদ্ধরত ও যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশগুলোর সাথে ভারতের ব্যাপক বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। সংঘাতদীর্ণ এই অঞ্চলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পরিবহণ পথের ওপর রয়েছে। ভারতের অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের চাহিদার একটি বড় অংশ এই অঞ্চল থেকেই মেটানো হয়। উপসাগরীয় দেশগুলোতে বসবাসরত ও কর্মরত প্রায় এক কোটি ভারতীয় নাগরিকের পাশাপাশি, ওই জলসীমায় চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে কর্মরত বিপুল সংখ্যক ভারতীয় নাবিকদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতি খুবই জটিল এবং ভারতের সংসদ থেকে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে একটি ঐক্যবদ্ধ সর্বসম্মত বার্তা যাওয়া জরুরি। ভারতীয় নাগরিকদের সুরক্ষায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই সংঘাত-বিধ্বস্ত দেশগুলিতে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। তিনি জানান যে, পশ্চিম এশিয়ার অধিকাংশ দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগতভাবে দু’দফায় কথা বলেছেন এবং ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তার আশ্বাস মিলেছে। শ্রী মোদী বলেন, যাঁরা আহত হয়েছেন, তাঁদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ায় থাকা ভারতীয় নাগরিকদের জন্য কনস্যুলার ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার বিস্তারিত বিবরণও প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেন। তিনি বলেন যে, সংঘাত-বিধ্বস্ত দেশগুলির ভারতীয় দূতাবাসগুলি নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে চলেছে এবং নিয়মিত পরামর্শমূলক নির্দেশিকা জারি করছে। পাশাপাশি ভারত ও সংঘাত-বিধ্বস্ত দেশ — উভয় স্থানেই ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম ও জরুরি হেল্পলাইন রয়েছে। ভারত থেকে যাওয়া কর্মী ও পর্যটক – সকলকেই প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলে প্রধানমন্ত্রী জানান। তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ৩,৭৫,০০০-এরও বেশি ভারতীয় নিরাপদে দেশে ফিরে এসেছেন; এর মধ্যে কেবল ইরান থেকেই ফিরেছেন প্রায় ১,০০০ ভারতীয়, যাঁদের মধ্যে ৭০০-এরও বেশি হলেন তরুণ চিকিৎসা-বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা ভারতীয় স্কুলগুলিতে দশম ও দ্বাদশ শ্রেণীর নির্ধারিত পরীক্ষা সিবিএসই বাতিল করেছে এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালু রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, বিপুল পরিমাণে অপরিশোধিত তেল, গ্যাস, সার এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হরমুজ প্রণালী দিয়ে ভারতে পৌঁছায় এবং যুদ্ধের পর থেকে এই প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষের অসুবিধা দূর সরকারের মূল লক্ষ্য; সেজন্য বাড়িতে এলপিজি-র সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং দেশে এলপিজি উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সারা দেশে পেট্রোল ও ডিজেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার উদ্যোগী বলে প্রধানমন্ত্রী জানান। তিনি বলেন, বিগত এক দশকে জ্বালানির বিকল্প উৎস খোঁজার বিষয়টিতে জোর দেওয়া হয়েছে এবং তার ফলও মিলেছে। তিনি সভাকে জানান যে, ভারত বর্তমানে ৪১টি দেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করে। ১১ বছর আগে ২৭টি দেশ থেকে জ্বালানি আমদানি হত। ফলে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীলতা এখন অনেক কম। কৌশলগত মজুতের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, ভারত ঠিক এই ধরনের সময়ের কথা মাথায় রেখেই অপরিশোধিত তেল মজুত করায় অগ্রাধিকার দিয়েছে। তিনি বলেন, তেল বিপণন সংস্থাগুলির নিজস্ব মজুত ছাড়াও, আপৎকালীন পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য সঞ্চিত রয়েছে ৫৩ লক্ষ মেট্রিক টনেরও বেশি পেট্রোলিয়াম। সঞ্চয়ের ক্ষমতার ৬৫ লক্ষ মেট্রিক টনেরও বেশি মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। গত ১১ বছরে দেশের জ্বালানি শোধনের ক্ষমতাও অনেকটাই বেড়েছে। বিশ্বের সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ভারতে তেল, গ্যাস, সার ও অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্যবাহী জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সরকার উদ্যোগী বলে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালীতে আটকে থাকা বেশ কয়েকটি জাহাজ দেশে পৌঁছেছে। ভারতে ইথানল মিশ্রণের ক্ষেত্রে অগ্রগতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এক দশক আগে মিশ্রণের অনুপাত ছিল ১-১.৫ শতাংশ, এখন তা পৌঁছেছে ২০ শতাংশে। এর ফলে বছরে প্রায় সাড়ে চার কোটি ব্যারেল তেল আমদানি কমানো সম্ভব হয়েছে। রেললাইনের বিদ্যুতায়নের উদ্যোগের ফলে বছরে প্রায় ১৮০ কোটি লিটার ডিজেল সাশ্রয় হয়েছে। ২০১৪ সালে দেশে মেট্রো রেলপথের দৈর্ঘ্য ছিল ২৫০ কিলোমিটার, এখন তা পৌঁছেছে ১,১০০ কিলোমিটারে। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে রাজ্যগুলিকে ১৫,০০০ বৈদ্যুতিক বাস সরবরাহ করা হয়েছে বলেও প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, জ্বালানি আধুনিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড এবং পশ্চিম এশিয়া জ্বালানির প্রধান উৎস হওয়ায় সারা বিশ্বের সামনেই বড় চ্যালেঞ্জে এসে পড়েছে। আন্তঃমন্ত্রক দল গঠন করে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে প্রধানমন্ত্রী জানান। কৃষিক্ষেত্রে যুদ্ধের প্রভাব প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেন যে, ভারতের কৃষকরা পর্যাপ্ত খাদ্যশস্যের মজুত নিশ্চিত করেছেন এবং সরকার খরিফ শস্য উৎপাদনও বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করছে। কোভিড-১৯-এর সময় আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দাম প্রতি বস্তা ৩,০০০ টাকায় পৌঁছে যাওয়া সত্ত্বেও ভারতীয় কৃষকরা ৩০০ টাকারও কম দামে তা পেয়েছেন। গত দশকে ছয়টি নতুন ইউরিয়া প্ল্যান্ট চালু করা হয়েছে, যা বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ৭৬ লক্ষ মেট্রিক টনেরও বেশি বাড়িয়েছে। একই সাথে, ডিএপি এবং এনপিকেএস সারের দেশীয় উৎপাদন প্রায় ৫০ লক্ষ মেট্রিক টন বাড়ানো হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন।
ডিজেলের ওপর কৃষকদের নির্ভরশীলতা কমাতে 'পিএম-কুসুম' প্রকল্পের আওতায় ২২ লক্ষেরও বেশি সৌর পাম্প তৈরি হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, সারা দেশের সমস্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পর্যাপ্ত কয়লার মজুত রয়েছে এবং ভারত টানা দ্বিতীয় বছর ১০০ কোটি টন কয়লা উৎপাদনের রেকর্ড গড়েছে। গত এক দশকে নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছে সে প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মোট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৫০ গিগাওয়াটের ঐতিহাসিক মাইলফলক অতিক্রম করেছে। গত ১১ বছরে শুধুমাত্র সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাই প্রায় ৩ গিগাওয়াট থেকে বেড়ে ১৪০ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে — এ কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান যে, প্রায় ৪০ লক্ষ বাড়ির ছাদে সৌর বিদ্যুৎ স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে, 'গোবরধন' প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে ২০০টি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট চালু রয়েছে এবং পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনেও জোর দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি সম্প্রতি অনুমোদিত 'ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্প'-এর মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে আরও ১,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে বলে তিনি জানান। কূটনীতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, ভারত বরাবরই শান্তির পক্ষে এবং অসামরিক ব্যক্তি ও জ্বালানি তথা পরিবহন পরিকাঠামোর ওপর হামলার বিরোধী। বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলা এবং 'হরমুজ প্রণালী'-র মতো আন্তর্জাতিক জলপথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যে কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, এ কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, কূটনীতির মাধ্যমে ভারতীয় জাহাজগুলির নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার চেষ্টা হচ্ছে। তিনি বলেন, মানবতা ও শান্তির আদর্শের প্রতি ভারত দায়বদ্ধ এবং সংলাপ ও কূটনীতিই হলো সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ। এই সংকটের সময় কোনো কোনো গোষ্ঠী পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দেশের পরিস্থিতি অশান্ত করে তোলার চেষ্টায় সামিল হতে পারে বলে প্রধানমন্ত্রী সাবধান করে দেন। সরকার এই ধরনের অপচেষ্টা রুখতে সর্বতোভাবে উদ্যোগী বলে আশ্বস্ত করেন তিনি। সংঘাত দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং কালোবাজারি কিংবা মজুতদারির বিরুদ্ধে প্রাদেশিক সরকারগুলিকেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে বলে প্রধানমন্ত্রী মনে করিয়ে দেন। কোভিডের বিপদ কাটিয়ে ওঠার মতো সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবারও দেশ যাবতীয় চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় সক্ষম হবে বলে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
SC/AC/DM...
(রিলিজ আইডি: 2244074)
ভিজিটরের কাউন্টার : 9