বন্দর, জাহাজ ও জলপথ মন্ত্রক
azadi ka amrit mahotsav

স্বাধীনতার পর প্রথমবার ডিব্রুগড় থেকে বাংলাদেশের পথে আন্তর্জাতিক পণ্যবাহী জাহাজ

বোগিবিল থেকে ঢাকার উদ্দেশে ৫৪০ টন এপিসিএল-এর মিথানল নিয়ে জাহাজের যাত্রা শুরু

অসমের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে যোগ দেন

ব্রহ্মপুত্রের ন্যাশনাল ওয়াটারওয়ে-২ হয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার জলপথে পণ্য পরিবহণের উজ্জল সম্ভাবনা

পোস্ট করার দিনক্ষণ: 05 OCT 2026 4:02PM by PIB Agartala

নয়াদিল্লি, ৫ অক্টোবর,২০২৬: স্বাধীনতার পর এই প্রথম আপার আসাম থেকে কোনও আন্তর্জাতিক বন্দরের উদ্দেশে পণ্যবাহী জাহাজ যাত্রা করল। আজ ডিব্রুগড়ের বোগিবিল টার্মিনাল থেকে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল নিয়ে বাংলাদেশের ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছে পণ্যবাহী জাহাজ। কেন্দ্রীয় বন্দর, জাহাজ চলাচল ও জলপথ মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল বোগিবিল থেকে ‘ডিএলবি পাটকাই’ জাহাজটির যাত্রার সূচনা করেন। ‘কুশল কোঁৱৰ’ টাগের সাহায্যে জাহাজটি যাত্রা শুরু করে। অসমের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

প্রায় ৭০ বছর আগে ডিব্রুগড়ের নদীবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই প্রথম সেখান থেকে বিদেশি বন্দরের উদ্দেশে পণ্য পাঠানো হল।

নামরূপে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা অসম পেট্রো-কেমিক্যালস লিমিটেড বা এপিসিএল উৎপাদিত মিথানলটি বাংলাদেশের ঢাকার পাঙ্গাঁও বন্দরে পৌঁছবে। জাহাজটি ভারতে ব্রহ্মপুত্র নদীর ন্যাশনাল ওয়াটারওয়ে-২ দিয়ে প্রায় ৭৬৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছবে। এরপর ইন্দো-বাংলাদেশ প্রোটোকল রুট বা আইবিপিআর-এর মাধ্যমে যাত্রা অব্যাহত থাকবে। ডিব্রুগড়ের বোগিবিল থেকে ঢাকার নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত জাহাজটি মোট প্রায় ১,৩০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করবে।

উত্তর-পূর্ব ভারতকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে ব্রহ্মপুত্রকে বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর পণ্য পরিবহণ করিডর হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, তা যাচাই করার জন্য এই যাত্রাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে নিয়মিত মিথানল পরিবহণের পরিকল্পনা রয়েছে। সম্প্রতি বোগিবিল ও ধুবড়িতে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন কমপ্লেক্স গড়ে ওঠায় এই পণ্য পরিবহণ সম্ভব হয়েছে।

অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেন, “আমাদের দাদু-ঠাকুমারা ডিব্রুগড় ঘাটে স্টিমারের বাঁশির শব্দ শুনে বড় হয়েছেন। ৭০ বছর ধরে সেই বাঁশির শব্দ স্তব্ধ ছিল এবং জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আজ আবার ডিব্রুগড় থেকে একটি জাহাজ বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা করছে। নদী কখনও আমাদের ব্যর্থ করেনি। কয়েক দশক ধরে যা অনুপস্থিত ছিল, তা হল এই নদীপথকে পুনরুজ্জীবিত করার ইচ্ছাশক্তি।”

আসামের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই দিনটিকে আসামের জন্য গর্বের দিন বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আসামের নিজস্ব পণ্য, নামরূপে উৎপাদিত পণ্য, এখন আসামের নিজস্ব নদীপথে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছচ্ছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চল আর দেশের প্রান্তবর্তী অঞ্চল নয়। এটি পূর্বের দিকে ভারতের প্রবেশদ্বার।”

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেন, এই যাত্রা একটি সূচনা, শেষ নয়। তিনি বলেন, “এটি প্রথম যাত্রা, শেষ নয়। আসামের যুব সমাজকে আমি বলব- এই নদীকে সঙ্গে নিয়ে স্বপ্ন দেখুন। বিশ্ব আর দূরে নয়। ভাটির দিকে এগোলেই বিশ্ব।”

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ‘ভারতের চা-রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত ডিব্রুগড় একটি গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর হিসেবে তার পুরনো গৌরব পুনরুদ্ধার করছে। ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে বিশ্বমানের পরিকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। তাঁর কথায়, “১৯৫৬ সালে যে স্টিমারের বাঁশির শব্দ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, আজ সেই বাঁশির শব্দ আবার শোনা যাচ্ছে।” একসময় পূর্ব ভারতের অন্যতম ব্যস্ত নদীবন্দর ছিল ডিব্রুগড়। ১৮৫৬ সাল থেকেই তৎকালীন ক্যালকাটা, বর্তমান কলকাতা, থেকে সরকারি স্টিমার ডিব্রুগড়ে পৌঁছত। ১৮৮২ সালে ডিব্রুগড় স্টিমার ঘাট থেকে ডিব্রু-সাদিয়া রেল পরিষেবা শুরু হয়। ১৯১৩ সালের মধ্যে প্রতিদিন ব্রহ্মপুত্র দিয়ে ডিব্রুগড় পর্যন্ত স্টিমার চলাচল করত। চা, কাঠ ও যাত্রী পরিবহণে এই জলপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের ফলে এই জলপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আসামের পণ্য কলকাতায় পৌঁছতে পূর্ব পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে যেতে হত। ১৯৫০ সালের ভূমিকম্পে ডিব্রুগড়ের কাছে নদীর তলদেশেরও পরিবর্তন ঘটে। ১৯৫৪ সালে ডিব্রুগড় ঘাট থেকে নিয়মিত পণ্য বুকিং বন্ধ হয়ে যায় এবং ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর ঘাটটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে চা পরিবহণ রেলপথে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় সীমান্তপথে নদী বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়।

১৯৭২ সালে ভারত ও বাংলাদেশ নদীপথে বাণিজ্য সংক্রান্ত প্রোটোকল স্বাক্ষর করে। ১৯৮৮ সালে সাদিয়া থেকে ধুবড়ি পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের ৮৯১ কিলোমিটার অংশকে ন্যাশনাল ওয়াটারওয়ে-২ ঘোষণা করা হয়। তবে এই জলপথে নিয়মিত পণ্য পরিবহণ শুরু হতে আরও সময় লাগে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে পান্ডু থেকে ধুবড়ি পর্যন্ত সিমেন্ট পরিবহণের মাধ্যমে নিয়মিত পণ্য পরিষেবা শুরু হয়।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, “কয়েক দশক ধরে সেই গৌরব ম্লান হতে দেওয়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ডিব্রুগড়কে তার প্রাপ্য মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বোগিবিল টার্মিনাল, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন কমপ্লেক্স এবং ‘জলবাহক’-এর অধীনে নির্দিষ্ট সময়সূচিভিত্তিক পণ্য পরিবহণ পরিষেবা এই ঐতিহাসিক শহরকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও বিশ্বমানের পরিকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করছে। ভবিষ্যতের জন্য পরিকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি ডিব্রুগড়ের ঐতিহ্যও ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। আজ আবার ডিব্রুগড় থেকে বিদেশি বন্দরের উদ্দেশে পণ্য রওনা হওয়ার মধ্য দিয়ে শহরটির গৌরবময় অতীত ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ একই নদীপথে মিলিত হল।”

এরপর থেকে এই জলপথে কার্যকলাপও বেড়েছে।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ হয়ে টাটা স্টিলের বার্জ পান্ডুতে পৌঁছয়। ২০২৩ সালে ‘এমভি গঙ্গা বিলাস’ ক্রুজ জাহাজ বাংলাদেশ হয়ে বারাণসী থেকে ডিব্রুগড় পর্যন্ত যাত্রা করে। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে বোগিবিল যাত্রী ও পণ্য টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় এবং ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে টার্মিনালটি চালু হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ‘জলবাহক’ পণ্য পরিবহণে উৎসাহদানের কর্মসূচি চালু করা হয়।

বন্দর, জাহাজ চলাচল ও জলপথ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের জাতীয় জলপথে পণ্য পরিবহণ ২০১৩-১৪ অর্থবর্ষে ১ কোটি ৮০ লক্ষ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ২১ কোটি ৮০ লক্ষ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জলপথ পরিকাঠামো উন্নয়নে ৬,৮০০ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ন্যাশনাল ওয়াটারওয়ে-২-এর উন্নয়ন, পান্ডুতে জাহাজ মেরামত কেন্দ্র এবং পান্ডু বন্দরের শেষ-মাইল সংযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মতো প্রকল্প রয়েছে।

সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেন, “নদীপথে যত টন পণ্য পরিবহণ করা হবে, তত কম জ্বালানি খরচ হবে এবং মহাসড়কে ট্রাকের সংখ্যাও কমবে।” তিনি জানান, আঞ্চলিক জলপথ সংযোগ গড়ে তুলতে ভারত বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও মায়ানমারের সঙ্গে কাজ করছে।

এই ঐতিহাসিক পণ্য পরিবহণে ইনল্যান্ড ওয়াটারওয়েজ অথরিটি অফ ইন্ডিয়া, আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস, কোচিন বাঙ্কার্স প্রাইভেট লিমিটেড এবং বাংলাদেশের সহযোগী সংস্থাগুলি অংশ নিয়েছে।

অনুষ্ঠানে অসমের মন্ত্রী চরণ বড়ো, বিমল বড়া ও সুশান্ত বর্গোহাঁই উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও রাজ্যসভার সদস্য তেরাশ গোয়ালা, ডিব্রুগড় বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক প্রশান্ত ফুকন এবং খোয়াং বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক চক্রধর গগৈ-সহ অন্যান্য জনপ্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে ইনল্যান্ড ওয়াটারওয়েজ অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার চিফ ইঞ্জিনিয়ার এ কে বনসল, আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান বিকুল চন্দ্র ডেকা-সহ এপিসিএল, আইডব্লিউএআই এবং আসাম সরকারের আধিকারিকরাও উপস্থিত ছিলেন।

*****

PS/PKS/KMD


(প্রেস বিজ্ঞপ্তির আইডি: 2319278) ভিজিটরদের কাউন্টার : 9
এই বিজ্ঞপ্তিটি পড়ুন এভাবে: English , Urdu , हिन्दी , Bengali , Assamese , Tamil , Telugu , Malayalam