PIB Backgrounder
কার্গিল বিজয় দিবস ২০২৬
বীরত্ব, আত্মবলিদান ও ভারতের অদম্য চেতনার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য
प्रविष्टि तिथि:
24 JUL 2026 3:50PM by PIB Kolkata
২৪ জুলাই, ২০২৬
কার্গিল বিজয় দিবস ‘অপারেশন বিজয়’-এর বীর সেনানীদের সাহস, আত্মত্যাগ এবং অদম্য সংকল্পের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে। এই দিনটি কার্গিল যুদ্ধে ভারতের ঐতিহাসিক বিজয়কে স্মরণ করে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাকারী সেই অমর চেতনাকে উদ্যাপন করেছে । একই সঙ্গে, এই উপলক্ষ কার্গিলের স্থায়ী উত্তরাধিকারেরও প্রতিফলন ঘটায়। এটি ভারতের সামরিক প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করে, নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে এবং দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় ভারতের অটল অঙ্গীকারকে আরও সুদৃঢ় করে।
যখন সাহস জয় করেছিল পর্বতশৃঙ্গ
কার্গিল যুদ্ধ ভারতের সামরিক ইতিহাসের অন্যতম গৌরবময় অধ্যায়। এটি অতুলনীয় সাহস, দৃঢ়তা এবং অদম্য সংকল্পের প্রতিফলন। আজও এটি জাতীয় গর্ব ও অনুপ্রেরণার এক চিরন্তন প্রতীক।
এ বছর দেশ কৃতজ্ঞতা ও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে ২৭তম কার্গিল বিজয় দিবস পালন করছে। এই দিনটি ১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধে ভারতের ঐতিহাসিক বিজয়কে স্মরণ করে। অসাধারণ সাহস ও অটল সংকল্পের মাধ্যমে ভারতীয় সেনারা কার্গিলের তুষারাবৃত শৃঙ্গগুলি পুনর্দখল করেছিলেন। ২৬ জুলাই আবারও লাদাখের দুর্গম পর্বতমালার উপর গর্বের সঙ্গে উড়েছিল তিরঙ্গা। তা আত্মত্যাগ, বীরত্ব এবং ভারতের অদম্য চেতনার এক চিরন্তন প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
কার্গিল সংঘাত শুরু হয় ১৯৯৯ সালের মে মাসে। অনুপ্রবেশকারীরা নিয়ন্ত্রণরেখা (Line of Control)-এর ওপার থেকে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উচ্চভূমির অবস্থানগুলি দখল করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল কাশ্মীর ও লাদাখের মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা। বৃহত্তর লক্ষ্য ছিল কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা। কিন্তু তারা একটি জাতির অদম্য মনোবলকে অবমূল্যায়ন করেছিল। ভারত ‘অপারেশন বিজয়’-এর মাধ্যমে জবাব দেয়। এই অভিযান ছিল সুপরিকল্পিত কৌশল, অটল সংকল্প এবং ভারতীয় সেনাদের অদম্য সাহসিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। টানা দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে তীব্র লড়াইয়ের পর সমস্ত অনুপ্রবেশকারীকে বিতাড়িত করা হয় এবং দখল হয়ে যাওয়া প্রতিটি অবস্থান পুনরায় ভারতের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে।
কার্গিল বিজয় দিবস মাতৃভূমির জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করা প্রতিটি বীর সেনানীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে। তাঁদের আত্মত্যাগ দেশের প্রতিটি ইঞ্চি ভূখণ্ড রক্ষায় ভারতের অঙ্গীকারকে আরও দৃঢ় করেছে। এই যুদ্ধ দেশের সামরিক প্রস্তুতি ও প্রতিরক্ষা নীতিতে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন এনেছে। সেই অভিজ্ঞতা আজও আরও শক্তিশালী ও আত্মনির্ভর ভারত গঠনের পথে দিশা দেখায়। এটি প্রতিটি ভারতীয়কে মনে করিয়ে দেয় যে, সাহস, আত্মত্যাগ, ঐক্য এবং সার্বভৌমত্ব চিরকালই জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি হয়ে থাকবে।
অপারেশন বিজয়ের পথে
লাহোর ঘোষণার অল্প কিছুদিন পর, ১৯৯৯ সালের গ্রীষ্মে কার্গিল যুদ্ধ শুরু হয়। যখন ভারতের অধিকাংশ অঞ্চল প্রচণ্ড গরমে পুড়ছিল, তখন কার্গিলের বরফে ঢাকা দুর্গম উচ্চভূমিতে চলছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। পাকিস্তানি বাহিনী ভারতীয় ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করে শীতকালে খালি করে রাখা কৌশলগত পাহাড়ি চৌকিগুলি দখল করে। বিশ্বের অন্যতম কঠিন যুদ্ধক্ষেত্রে এই সংঘাত সাহস, সহনশীলতা এবং আত্মত্যাগের কঠিন পরীক্ষা নিয়েছিল। আজও এটি দুই পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশের মধ্যে সংঘটিত একমাত্র প্রচলিত যুদ্ধ হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।
অনুপ্রবেশ
এই অনুপ্রবেশ ছিল পাকিস্তানের ‘অপারেশন বদর’-এর অংশ। পাকিস্তানি বাহিনী কাশ্মীরি জঙ্গিদের ছদ্মবেশে নিয়ন্ত্রণরেখা (Line of Control) অতিক্রম করে ভারতীয় অবস্থানগুলি দখল করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল কাশ্মীর ও লাদাখের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা। পাশাপাশি, সিয়াচেন হিমবাহে মোতায়েন ভারতীয় সেনাদের বিচ্ছিন্ন করে দেওয়াও তাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল। বৃহত্তর উদ্দেশ্য ছিল কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা।
১৯৯৯ সালের ৩ মে কার্গিল সেক্টরে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথম সন্দেহজনক গতিবিধির খবর দেন। সেই তথ্য যাচাই করতে অবিলম্বে রেকি (Reconnaissance) টহলদল পাঠানো হয়। পরবর্তীকালে ব্যাপক টহল এবং আকাশপথে নজরদারির মাধ্যমে অনুপ্রবেশের প্রকৃত ব্যাপ্তি প্রকাশ্যে আসে।
অনুপ্রবেশকারীরা শ্রীনগর–লে জাতীয় সড়কের ওপর নজরদারি করা কৌশলগত উচ্চভূমিতে শক্ত ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল। অনেক অবস্থানই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫,০০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতায় ছিল, ফলে প্রতিটি সামরিক অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে।
অপারেশন বিজয়ের সূচনা
ভারত সংযম, দৃঢ়তা এবং অটল সংকল্পের সঙ্গে জবাব দেয়। সরকার নির্দেশ দেয় যে, নিয়ন্ত্রণরেখা কোনো অবস্থাতেই অতিক্রম করা হবে না। লক্ষ্য ছিল একটাই- দখল হয়ে যাওয়া প্রতিটি চৌকি পুনর্দখল করা।
অনুপ্রবেশকারীদের বিতাড়িত করতে ভারতীয় সেনাবাহিনী ‘অপারেশন বিজয়’ শুরু করে। ১৯৯৯ সালের ২৬ মে ভারতীয় বায়ুসেনা ‘অপারেশন সাফেদ সাগর’-এর মাধ্যমে এই অভিযানে যোগ দেয়। ভারতীয় নৌবাহিনীও পূর্ণ শক্তি নিয়ে মোতায়েন হয় এবং স্থল, আকাশ ও সমুদ্র- প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারতের অটল সংকল্পের পরিচয় দেয়। তিন বাহিনী একযোগে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করে।
‘অপারেশন বিজয়’-এ ‘Contain, Evict and Deny’ কৌশল অনুসরণ করা হয়। শ্রীনগর–লে জাতীয় সড়কের ওপর নিয়ন্ত্রণকারী গুরুত্বপূর্ণ উচ্চভূমিগুলি পুনর্দখলকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। দ্রুত অতিরিক্ত সেনা, কামান, ইঞ্জিনিয়ারিং দল, বিশেষ সরঞ্জাম এবং রসদ মোতায়েন করা হয়। প্রবল শত্রু গোলাবর্ষণের মধ্যেও ভারতীয় সেনারা প্রায় খাড়া পাহাড় বেয়ে উপরে ওঠেন। হিমশীতল আবহাওয়া, অক্সিজেনের স্বল্পতা এবং অত্যন্ত দুর্গম ভূখণ্ডের মধ্যেও তাঁরা লড়াই চালিয়ে যান।
যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া লড়াইগুলি
টোলোলিংয়ের যুদ্ধ ছিল এই অভিযানের প্রথম বড় সাফল্যগুলির অন্যতম। ১৯৯৯ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে ভারতীয় সেনারা আক্রমণ শুরু করেন। ১৩ জুন পয়েন্ট ৪৫৯০ এবং টোলোলিং সম্পূর্ণভাবে পুনর্দখল করা হয়, যা পরবর্তী অগ্রযাত্রার পথ খুলে দেয়।
টাইগার হিলের যুদ্ধ কার্গিল যুদ্ধের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। দ্রাস সেক্টরের সর্বোচ্চ শৃঙ্গগুলির মধ্যে টাইগার হিল ছিল অন্যতম এবং এটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান লক্ষ্যগুলির একটি ছিল। এক সাহসী অভিযানের মাধ্যমে ১৯৯৯ সালের ৪ জুলাই এই শৃঙ্গ পুনর্দখল করা হয়, যা যুদ্ধে ভারতের পক্ষে পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
পয়েন্ট ৪৮৭৫, বাটালিক, মুশকোহ উপত্যকা এবং কাকসারেও তীব্র যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ভারতীয় সেনারা শৃঙ্গের পর শৃঙ্গ পুনর্দখল করে দখল হয়ে যাওয়া প্রতিটি অবস্থান পুনরুদ্ধার করেন। টানা প্রায় তিন মাসের নিরবচ্ছিন্ন অভিযানের পর ভারতের প্রতিটি দখলকৃত চৌকি পুনর্দখল করা হয়। নিয়ন্ত্রণরেখা (Line of Control) অতিক্রম না করেই ভারত বিজয় অর্জন করে এবং সংযম, পেশাদারিত্ব ও অটল সংকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সম্মান লাভ করে।
এক বিজয়, যা গোটা জাতিকে অনুপ্রাণিত করেছিল
কার্গিল যুদ্ধ ভারতের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে উঠেছে। এই যুদ্ধ ভারতীয় সেনাদের অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় তুলে ধরে এবং সমগ্র জাতিকে গর্বের বন্ধনে একত্রিত করে। ১৯৯৯ সালের ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে ‘অপারেশন বিজয়’-এর সাফল্যের ঘোষণা করেন। তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সাহস, আত্মত্যাগ এবং অটল সংকল্পের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
এই বিজয় পুনরায় প্রমাণ করে যে, ভারতের প্রতিটি ইঞ্চি ভূখণ্ড যে কোনো মূল্যে রক্ষা করা হবে। এটি দেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় করে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভারতীয়কে অনুপ্রাণিত করে।
কার্গিলকে সংজ্ঞায়িত করা বীরত্ব
অগণিত বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের ফলেই কার্গিলে এই বিজয় সম্ভব হয়েছিল। পুনর্দখল করা প্রতিটি শৃঙ্গ ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর অদম্য সংকল্প ও আত্মত্যাগের সাক্ষ্য বহন করে। ‘অপারেশন বিজয়’-এ প্রতিটি সেনার অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ, তবে কয়েকটি অসাধারণ বীরত্বগাথা এই যুদ্ধের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে ওঠে। গ্রেনেডিয়ার যোগেন্দ্র সিং যাদব, ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রা, ক্যাপ্টেন বিজয়ন্ত থাপারসহ বহু বীর সেনানী সাহস ও নিঃস্বার্থ সেবার প্রতীক হয়ে ওঠেন।
দেশ এই অসাধারণ বীরত্বকে সর্বোচ্চ সামরিক সম্মানে ভূষিত করে। চার জন সেনাকে ভারতের সর্বোচ্চ বীরত্ব সম্মান ‘পরমবীর চক্র’ প্রদান করা হয়। নয় জন পান ‘মহাবীর চক্র’ এবং ৫৫ জনকে প্রদান করা হয় ‘বীর চক্র’। এক জন সেনাকে ‘সর্বোত্তম যুদ্ধ সেবা পদক’ প্রদান করা হয়। ছয় জন পান ‘উত্তম যুদ্ধ সেবা পদক’ এবং ৮ জনকে দেওয়া হয় ‘যুদ্ধ সেবা পদক’। এছাড়া ৮৩ জনকে ‘সেনা পদক’ এবং ২৪ জনকে ‘বায়ুসেনা পদক’ প্রদান করা হয়। এই সম্মানগুলি কার্গিল যুদ্ধে প্রদর্শিত অসাধারণ সাহস, নেতৃত্ব এবং আত্মত্যাগের স্বীকৃতি বহন করে।
যুদ্ধক্ষেত্রের শিক্ষা থেকে আরও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পথে
কার্গিল যুদ্ধ ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিকাশে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়। এই যুদ্ধ আরও সুদৃঢ় সমন্বয়, দ্রুত আধুনিকীকরণ এবং অধিক আত্মনির্ভরতার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে তোলে। পরবর্তী সময়ে ভারত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে এবং দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তুলতে বিস্তৃত সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আজ সেই প্রচেষ্টাগুলি আরও শক্তিশালী, অধিক সক্ষম এবং ক্রমশ আত্মনির্ভর সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলছে।
উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সংস্কার ও উদ্যোগ নিচে তুলে ধরা হলঃ
সামরিক বিষয়ক বিভাগের (Department of Military Affairs) প্রতিষ্ঠা
উচ্চতর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা সংস্কারের অংশ হিসেবে ‘ডিপার্টমেন্ট অব মিলিটারি অ্যাফেয়ার্স’ (Department of Military Affairs) গঠন করা হয়। এই বিভাগ চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ (CDS)-এর অধীনে পরিচালিত হয় এবং CDS-ই এর সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই বিভাগ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বায়ুসেনার মধ্যে সমন্বিত কার্যপ্রণালীকে উৎসাহিত করে। পাশাপাশি, তিন বাহিনীর মধ্যে সমন্বিত প্রতিরক্ষা নীতি, পরিকল্পনা এবং কার্যপদ্ধতি গড়ে তুলতেও সহায়তা করে।
চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ (CDS) পদ সৃষ্টি
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
সংস্কারগুলির একটি ছিল ‘চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ (CDS)’ পদ সৃষ্টি। CDS সরকারের একক সামরিক উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এই পদ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বায়ুসেনার মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জেনারেল বিপিন রাওয়াত ২০২০ সালে ভারতের প্রথম CDS হন। বর্তমানে এই পদে রয়েছেন জেনারেল এন. এস. রাজা সুব্রামণি।
প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (FDI)
প্রতিরক্ষা শিল্পে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের সুযোগ উন্মুক্ত করা হয়েছে। নতুন প্রতিরক্ষা শিল্প লাইসেন্সের ক্ষেত্রে অটোমেটিক রুটে FDI-র সীমা ৭৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি আনা হলে সরকারি অনুমোদনের মাধ্যমে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত FDI-রও অনুমতি রয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত এই খাতে ₹৬,৬৭০.৫৯ কোটি টাকার প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) এসেছে। উন্নত প্রতিরক্ষা উৎপাদনকে শক্তিশালী করতে সরকার বিদেশি অরিজিনাল ইকুইপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারারদের (OEMs) সঙ্গে যৌথ উন্নয়ন ও যৌথ উৎপাদনকেও উৎসাহিত করছে।
প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি
ভারতের প্রতিরক্ষা বরাদ্দ ২০১৩–১৪ সালে ₹২.৫৩ লক্ষ কোটি থেকে বেড়ে ২০২৬–২৭ সালে ₹৭.৮৫ লক্ষ কোটিতে পৌঁছেছে। একইভাবে, মূলধনী ব্যয় ২০১৪–১৫ সালের ₹৯৪,৫৮৭.৯৫ কোটি থেকে বেড়ে ২০২৬–২৭ সালে ₹২.১৯ লক্ষ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম, পরিকাঠামো এবং কৌশলগত সম্পদে এই বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে ভারতের সামরিক সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করছে।
প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি
২০২৫–২৬ অর্থবর্ষে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন সর্বকালের সর্বোচ্চ ₹১.৭৮ লক্ষ কোটিতে পৌঁছেছে, যা ২০১৪–১৫ সালের ₹৪৬,৪২৯ কোটির প্রায় চার গুণ।
প্রতিরক্ষা রপ্তানি ২০১৩–১৪ সালে ₹৬৮৬ কোটি থেকে বেড়ে ২০২৫–২৬ সালে ₹৩৮,৪২৪ কোটিতে পৌঁছেছে, যা ৫৬ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি। বর্তমানে ভারতীয় প্রতিরক্ষা সামগ্রী বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর প্রভাবে ভারত ধীরে ধীরে একটি প্রতিরক্ষা উৎপাদনকারী দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে, যেখানে আগে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ সরঞ্জামের জন্য আমদানির উপর নির্ভর করতে হতো।
দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদনে গতি সঞ্চার
প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ‘সৃজন ডিফেন্স পোর্টাল’ চালু করেছে। দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে এই পোর্টাল প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রের সরকারি সংস্থা (DPSUs) এবং তিন বাহিনীর সদর দপ্তরের সঙ্গে শিল্প প্রতিষ্ঠান, MSME এবং স্টার্টআপগুলিকে সংযুক্ত করে। ‘আত্মনির্ভর ভারত’ উদ্যোগের অধীনে ২০২১ সালে ‘পজিটিভ ইন্ডিজেনাইজেশন লিস্ট’ চালু করা হয়।
২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত DPSU-র ৫,০১২টি সামগ্রী নিয়ে পাঁচটি ‘পজিটিভ ইন্ডিজেনাইজেশন লিস্ট’ প্রকাশিত হয়েছে। গত পাঁচ বছরে ‘পজিটিভ ইন্ডিজেনাইজেশন লিস্ট’-এর ৩,২০৪টি সামগ্রীসহ ১৫,৭০০টিরও বেশি প্রতিরক্ষা সামগ্রী দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হয়েছে। DPSU-গুলি ₹৯,৭৮২ কোটি টাকার দেশীয় অর্ডার দিয়েছে, যার ফলে MSME, স্টার্টআপ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হয়েছে।
আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা উৎপাদনে গতি আনছে ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডর
ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডরগুলি প্রতিরক্ষা উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ বিকাশকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। এগুলি আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করছে এবং সমন্বিত শিল্প পরিবেশ গড়ে তুলছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত উত্তরপ্রদেশ ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডরে ₹৪২,০৫৭ কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এসেছে, যার মধ্যে ₹৪,৪০৯ কোটি টাকার বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হয়েছে। পাশাপাশি, পরীক্ষা ও উদ্ভাবন সক্ষমতা বাড়াতে ‘ডিফেন্স টেকনোলজি অ্যান্ড টেস্ট সেন্টার (DTTC)’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। একই সময়ে, তামিলনাড়ু ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডরে ₹৩২,৬৯৯ কোটি টাকার বিনিয়োগ আকৃষ্ট হয়েছে, যার মধ্যে ₹৬,৪৪৬ কোটি টাকার বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হয়েছে। এই দুটি করিডর শিল্প পরিকাঠামোর উন্নয়ন ত্বরান্বিত করছে, দেশীয় উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে।
অগ্নিপথ প্রকল্প
চার বছরের নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য যুবক ও যুবতীদের ‘অগ্নিবীর’ হিসাবে সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগের উদ্দেশ্যে ‘অগ্নিপথ প্রকল্প’ চালু করা হয়েছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন, প্রযুক্তিনির্ভর এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এক তরুণ বাহিনী গড়ে তোলা। অগ্নিবীররা সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিশেষ দক্ষতা উন্নয়ন এবং IGNOU ও NIOS-এর মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষার সুযোগ পান। এছাড়াও, এই প্রকল্পের মাধ্যমে জাতীয়ভাবে স্বীকৃত দক্ষতার শংসাপত্র এবং চাকরি-পরবর্তী কর্মজীবনের সুযোগও প্রদান করা হয়।
কার্গিলের উত্তরাধিকার আজও এমন নানা সংস্কারকে অনুপ্রাণিত করছে, যা ভারতের সশস্ত্র বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করছে এবং দেশের নিরাপত্তাকে আরও সুদৃঢ় করছে।
ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত সশস্ত্র বাহিনীর পথে
কার্গিল যুদ্ধের পর থেকে যুদ্ধের ধরন উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তি, অধিকতর অগ্নিশক্তি এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অপরিহার্য। আধুনিক যুদ্ধসরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়নের মাধ্যমে ভারত তার সামরিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করেছে। এর ফলে স্থল, আকাশ, সমুদ্র, মহাকাশ এবং অন্যান্য উদীয়মান ক্ষেত্রে ভারতের অপারেশনাল প্রস্তুতি আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই পরিবর্তনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম ও উদীয়মান প্রযুক্তির উল্লেখ নিচে করা হল।
আধুনিক প্ল্যাটফর্মের অন্তর্ভুক্তি
যুদ্ধ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অপারেশনাল কার্যকারিতা আরও উন্নত করতে ভারত তিন বাহিনীতেই আধুনিক প্ল্যাটফর্ম অন্তর্ভুক্ত করেছে।
অর্জুন Mk IA যুদ্ধ ট্যাঙ্ক: ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে অর্জুন Mk IA যুদ্ধ ট্যাঙ্ক অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে ভারতের দেশীয় সাঁজোয়া যুদ্ধক্ষমতা আরও শক্তিশালী হয়েছে।
আইএনএস বিক্রান্ত (INS Vikrant): ভারতের প্রথম দেশীয় বিমানবাহী রণতরী আইএনএস বিক্রান্ত ২০২২ সালের ২ সেপ্টেম্বর কমিশন করা হয়। এটি দেশের সামুদ্রিক সক্ষমতা ও আত্মনির্ভরতার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
রাফাল যুদ্ধবিমান: ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত ২৬টি রাফাল এম-সহ মোট ৬২টি রাফাল যুদ্ধবিমান পরিচালনা করবে। ফ্রান্সের পর ভারতই হবে প্রথম দেশ, যারা রাফালের উভয় সংস্করণ পরিচালনা করবে।
অ্যাপাচি ও চিনুক হেলিকপ্টার: অ্যাপাচি আক্রমণকারী হেলিকপ্টার এবং চিনুক ভারী পরিবহণ হেলিকপ্টার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ভারতের যুদ্ধক্ষমতা এবং কৌশলগত আকাশপথে পরিবহণ সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
ড্রোন যুদ্ধের অন্তর্ভুক্তি: ভারত তার সামরিক কৌশলে ড্রোন যুদ্ধকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। বর্তমানে ড্রোন নজরদারি, রেকি, নির্ভুল অভিযান এবং যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ব্রহ্মোস ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র: ২০০১ সালের ১২ জুন প্রথম সফলভাবে ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়। এই বহুমুখী সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র স্থল, সমুদ্র এবং আকাশ—তিনটি প্ল্যাটফর্ম থেকেই উৎক্ষেপণ করা যায়। এর পাল্লা সর্বোচ্চ ২৯০ কিলোমিটার এবং এটি প্রায় ম্যাক ২.৮ গতিতে উড়তে সক্ষম।
প্রজেক্ট ১৭এ স্টেলথ ফ্রিগেট: প্রজেক্ট ১৭এ হল ভারতীয় নৌবাহিনীর উন্নত স্টেলথ ফ্রিগেট কর্মসূচি, যার অধীনে সাতটি পরবর্তী প্রজন্মের গাইডেড মিসাইল যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করা হচ্ছে। এই ফ্রিগেটগুলি আকাশ, সমুদ্রপৃষ্ঠ এবং সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধ পরিচালনার জন্য নকশা করা হয়েছে।
সন্ধায়ক শ্রেণীর সমীক্ষা জাহাজ: সন্ধায়ক শ্রেণির সমীক্ষা জাহাজ সমুদ্রতল ও উপকূলীয় জলসীমার মানচিত্র তৈরির মাধ্যমে ভারতীয় নৌবাহিনীর হাইড্রোগ্রাফিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এই দেশীয় শ্রেণীর জাহাজগুলির মধ্যে রয়েছে আইএনএস সন্ধায়ক, আইএনএস নির্দেশক, আইএনএস ইক্ষক এবং আইএনএস সংশোধক। এগুলি ভারতের সামুদ্রিক সমীক্ষা ও নৌ-পরিচালনা সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করছে।
অর্ণালা শ্রেণীর অগভীর জলসীমায় সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধজাহাজ: অর্ণালা শ্রেণীর যুদ্ধজাহাজ ভারতীয় নৌবাহিনীর উপকূলীয় প্রতিরক্ষা এবং সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছে। এই দেশীয় আটটি জাহাজের শ্রেণীর মধ্যে রয়েছে আইএনএস অর্ণালা, আইএনএস আন্দ্রোথ, আইএনএস আনজাদ্বীপ, আইএনএস আমিনি, আইএনএস অভয়, আইএনএস আগ্রে, আইএনএস অক্ষয় এবং সম্প্রতি কমিশনপ্রাপ্ত আইএনএস অজয়। আইএনএস অর্ণালা ভারতীয় নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত বৃহত্তম ওয়াটারজেটচালিত যুদ্ধজাহাজ।
উদীয়মান প্রযুক্তি ও কৌশলগত সক্ষমতা
ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য সশস্ত্র বাহিনীকে প্রস্তুত করতে ভারত উন্নত প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে।
মিশন শক্তি: ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ ড. এ.পি.জে. আবদুল কালাম দ্বীপ থেকে ভারত সফলভাবে ‘মিশন শক্তি’ নামে অ্যান্টি-স্যাটেলাইট ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। এই সাফল্যের মাধ্যমে ভারত অ্যান্টি-স্যাটেলাইট সক্ষমতাসম্পন্ন বিশ্বের অল্প কয়েকটি দেশের অন্যতম হয়ে ওঠে।
প্রতিরক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI): ২০২২ সালে ভারত নজরদারি, সাইবার নিরাপত্তা, লজিস্টিকস, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সহায়তার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ৭৫টি প্রযুক্তি চালু করে।
মিশন দিব্যাস্ত্র: ২০২৪ সালের ১১ মার্চ ‘মিশন দিব্যাস্ত্র’-এর অধীনে ভারত সফলভাবে একাধিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম একটি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়, যা ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
পিনাকা লং রেঞ্জ গাইডেড রকেট: ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর পিনাকা লং রেঞ্জ গাইডেড রকেটের প্রথম সফল উড্ডয়ন পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। পরীক্ষায় রকেটটি ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত পাল্লা প্রদর্শন করে এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদ করে।
উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা: ২০২৫ সালের ২৩ আগস্ট DRDO সফলভাবে একটি উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পরীক্ষা চালায়। এতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক, স্বল্প-পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্র এবং লেজারভিত্তিক প্রযুক্তির সমন্বয় রয়েছে।
হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি: ভারত হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য পরবর্তী প্রজন্মের প্রপালশন প্রযুক্তির উন্নয়নে অগ্রগতি অর্জন করেছে। এবছর জানুয়ারি মাসে DRDO দীর্ঘ সময়ব্যাপী স্ক্র্যামজেট কমবাস্টর গ্রাউন্ড টেস্ট সফলভাবে সম্পন্ন করে। হায়দরাবাদে স্থাপিত নতুন ‘হাইপারসনিক উইন্ড টানেল’ ভবিষ্যতের উচ্চগতির ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নে সহায়তা করছে।
কুশা দূরপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র: ২০২৬ সালের জুলাই মাসে DRDO সফলভাবে ‘কুশা’ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম উড্ডয়ন পরীক্ষা সম্পন্ন করে। পরীক্ষায় এটি একটি উচ্চগতির কৃত্রিম আকাশপথের হুমকিকে সফলভাবে প্রতিহত করে। এই ব্যবস্থা বিস্তৃত পাল্লা ও উচ্চতায় যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, মানববিহীন আকাশযান (UAV) এবং বৃহৎ শত্রু বিমান ধ্বংস করতে সক্ষম। এটি DRDO-র বিভিন্ন গবেষণাগার এবং শিল্প সহযোগীদের যৌথ উদ্যোগে দেশীয়ভাবে তৈরি হয়েছে।
দূরপাল্লার ভূমি আক্রমণকারী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র: ২০২৬ সালের জুন মাসে ড. এ.পি.জে. আবদুল কালাম দ্বীপ থেকে DRDO সফলভাবে দূরপাল্লার ভূমি আক্রমণকারী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের উড্ডয়ন পরীক্ষা চালায়। ক্ষেপণাস্ত্রটি পরীক্ষার সব নির্ধারিত লক্ষ্য সফলভাবে পূরণ করে। এটি সম্পূর্ণ দেশীয়ভাবে উন্নত একটি ব্যবস্থা, যার সমস্ত প্রধান উপ-ব্যবস্থা DRDO-র গবেষণাগার এবং ভারতীয় শিল্প অংশীদারদের দ্বারা নির্মিত।
নেত্র এয়ারবোর্ন আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল (AEW&C) সিস্টেম: ২০২৬ সালের জুন মাসে DRDO দেশীয়ভাবে নির্মিত ‘নেত্র’ এয়ারবোর্ন আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল (AEW&C) ব্যবস্থার জন্য ‘ফাইনাল অপারেশনাল ক্লিয়ারেন্স’ শংসাপত্র হস্তান্তর করে। এই ব্যবস্থা DRDO, ভারতীয় বায়ুসেনা এবং শিল্প অংশীদারদের যৌথ উদ্যোগে তৈরি হয়েছে। এটি আকাশপথে নজরদারি, পরিস্থিতি সম্পর্কে তাৎক্ষণিক সচেতনতা এবং যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে।
আধুনিক যুদ্ধসরঞ্জাম থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রজন্মের প্রযুক্তি—ভারত ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত এক শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে নিরন্তর এগিয়ে চলেছে। এই সক্ষমতাগুলি প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করছে, অপারেশনাল প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করছে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষমতাকে আরও সুদৃঢ় করছে।
কার্গিলের চিরস্থায়ী উত্তরাধিকার
একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর প্রকৃত গুরুত্ব তখনই প্রতিফলিত হয়, যখন তার সঙ্গে অটল সংকল্পও যুক্ত থাকে। কার্গিল যুদ্ধের পর থেকে ভারত ধারাবাহিকভাবে তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং পরিবর্তিত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিই আজও দেশের নিরাপত্তা নীতি ও সামরিক কার্যপদ্ধতিকে পরিচালিত করছে।
সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ও বালাকোট বিমান হামলা
গত এক দশকে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের প্রতিক্রিয়া এক নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। উরি জঙ্গি হামলার পর ২০১৬ সালের ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত সার্জিক্যাল স্ট্রাইক পরিচালনা করে। এই অভিযানে নিয়ন্ত্রণরেখা (Line of Control)-এর ওপারে সন্ত্রাসবাদী ও তাদের মদতদাতাদের বড় ধরনের ক্ষতি করা হয়। সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে এটি ছিল ভারতের আরও সক্রিয় ও দৃঢ় অবস্থানের প্রতিফলন।
কয়েক বছর পর, ২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলওয়ামা জঙ্গি হামলায় ৪০ জন CRPF জওয়ান শহিদ হন। এর দ্রুত জবাব দেয় ভারত। ২০১৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত বালাকোট বিমান হামলায় জইশ-ই-মোহাম্মদের (JeM) বিপুল সংখ্যক জঙ্গিকে নির্মূল করা হয়। লক্ষ্যবস্তু ছিল জনবসতি থেকে দূরে অবস্থিত একটি ঘাঁটি, যার নেতৃত্বে ছিল JeM প্রধান মাসুদ আজহারের ভগ্নিপতি মৌলানা ইউসুফ আজহার। এই পূর্ব-প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপগুলি বিশ্বকে স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, সন্ত্রাসবাদকে হাতিয়ার করে পরিচালিত প্রক্সি যুদ্ধ আর ভারত মেনে নেবে না।
অপারেশন সিঁদুর
২০২৫ সালের মে মাসে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মাধ্যমে ভারতের পরিবর্তিত সামরিক নীতির আরও এক স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। পাহেলগামে সাধারণ নাগরিকদের উপর সন্ত্রাসবাদী হামলার পর এই অভিযান পরিচালিত হয়। ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী পাকিস্তান এবং পাকিস্তান অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরের নয়টি সন্ত্রাসবাদী ঘাঁটিতে সফল আঘাত হানে।
এই অভিযানে নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য, ড্রোন, লয়টারিং মিউনিশন এবং বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহার করা হয়। জইশ-ই-মোহাম্মদ (JeM) এবং লস্কর-ই-তইবার (LeT) একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড সেন্টার ধ্বংস করা হয়। এই হামলায় ১০০-রও বেশি সন্ত্রাসবাদী নিহত হয়। নিহতদের মধ্যে আইসি-৮১৪ বিমান ছিনতাই এবং পুলওয়ামা বিস্ফোরণের সঙ্গে যুক্ত ইউসুফ আজহার, আবদুল মালিক রউফ এবং মুদাসির আহমদের মতো ব্যক্তিরাও ছিল।
গত ৭ ও ৮ মে পাকিস্তান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ভারতের সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত সেই হামলা প্রতিহত করে। এই প্রতিক্রিয়ায় ভারতের নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা এবং সমন্বিত কাউন্টার-আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেম (Counter-UAS) গ্রিডের কার্যকারিতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
কার্গিল থেকে ‘অপারেশন সিঁদুর’—সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের প্রতিক্রিয়া ক্রমশ আরও সক্রিয়, নির্ভুল এবং দৃঢ় হয়ে উঠেছে।
কার্গিলের চেতনাকে উদ্যাপন
কার্গিলের উত্তরাধিকার যেমন ভারতের সামরিক সংকল্পকে আজও দৃঢ় করে, তেমনই তা রাষ্ট্রের সম্মিলিত স্মৃতিতেও অমলিন হয়ে রয়েছে। প্রতি বছর কার্গিল বিজয় দিবসে গোটা দেশ ১৯৯৯ সালের সেই বীর সেনানীদের সাহস ও আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। তাঁদের সর্বোচ্চ আত্মবলিদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দেশজুড়ে নানা স্মারক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। এই উদ্যোগগুলি তাঁদের গৌরবময় উত্তরাধিকারকে উদ্যাপন করার পাশাপাশি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সাহস, কর্তব্যবোধ এবং দেশপ্রেমের আদর্শে অনুপ্রাণিত করে।
শৌর্য বিজয় যাত্রা
এ বছর ১৪ জুলাই প্রতিরক্ষামন্ত্রী শ্রী রাজনাথ সিং ১৩ দিনব্যাপী ‘শৌর্য বিজয় যাত্রা’-র সূচনা করেন। মোটরসাইকেল অভিযানটি নয়াদিল্লির ন্যাশনাল ওয়ার মেমোরিয়াল থেকে শুরু হয়। মোট ১,৯০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে এটি দ্রাসের কার্গিল ওয়ার মেমোরিয়ালে গিয়ে শেষ হবে। এই অভিযানে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষা কর্মী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্য-সহ মোট ২৮ জন রাইডার অংশগ্রহণ করেন। এই অভিযানের মূলমন্ত্র—“One Ride, One Nation, One Salute.”
হুইলস অব ভ্যালর: সঞ্চার শক্তি
দেশব্যাপী ‘হুইলস অফ ভ্যালর: সঞ্চার শক্তি’ অভিযানের অংশ হিসাবে ২০২৬ সালের ১ জুলাই কর্পস অফ সিগন্যালস ডেয়ার ডেভিলস একটি নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়ে। দশজন রাইডার দুটি মোটরসাইকেলে অটল টানেলের অন্দরে কসরত প্রদর্শন করেন। তাঁরা ৯.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেলটি ৯ মিনিট ৪৭.৯৭ সেকেন্ডে অতিক্রম করেন। এই কৃতিত্ব কার্গিল বিজয় দিবসের চেতনাকে সম্মান জানায় এবং একই সঙ্গে সামরিক দক্ষতা, সহনশীলতা ও দলগত সমন্বয়ের অনন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরে।
টাইগার হিল অভিযান ২০২৬
এ বছর ১৭ জুলাই ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং দ্রাসের সিভিল প্রশাসন যৌথভাবে ‘টাইগার হিল অভিযান’-এর আয়োজন করে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল কার্গিল যুদ্ধের উত্তরাধিকার সংরক্ষণের পাশাপাশি, সামরিক পর্যটনকে উৎসাহিত করা। এই অভিযানে স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত ১১ জন ট্রেকিং গাইডও অংশগ্রহণ করেন, যার ফলে স্থানীয় যুবকদের জন্য জীবিকার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রাক্তন সেনা ও বীর সেনানীদের সম্মাননা
এ বছরই ১৬ জুলাই তিন বাহিনীর প্রাক্তন সেনাকর্মী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরা কার্গিল ওয়ার মেমোরিয়াল ও হেরিটেজ হাট মিউজিয়াম পরিদর্শন করেন। এই সফরের মাধ্যমে কার্গিলের বীর সেনানীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় এবং প্রাক্তন সেনা, কর্মরত সেনাকর্মী ও তাঁদের পরিবারের মধ্যে চিরস্থায়ী বন্ধন আর-ও দৃঢ় হয়।
এ বছর ১০ জুলাই প্রাক্তন সেনাকর্মী, স্কুলের শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় গ্রামবাসীরাও খালুবার ওয়ার মেমোরিয়ালে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশপ্রেম, সাহস এবং নিঃস্বার্থ সেবার চিরন্তন মূল্যবোধ পুনরায় তুলে ধরা হয়।
স্মারক ট্রেক ও সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শনী
এবছর ১৩ জুলাই ১৩৭ জন সেনাসদস্য ‘পয়েন্ট ৫১৪০’ (গান হিল নামেও পরিচিত) পর্যন্ত একটি স্মারক ট্রেকে অংশগ্রহণ করেন। ‘অপারেশন বিজয়’-এ রেজিমেন্ট অফ আর্টিলারির নির্ণায়ক অবদানকে সম্মান জানাতেই এই ট্রেকের আয়োজন করা হয়।
ভারতীয় সেনাবাহিনী হানলেতে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শনীরও আয়োজন করে। এই প্রদর্শনীতে আধুনিক অস্ত্র, ড্রোন এবং নজরদারি ব্যবস্থা প্রদর্শিত হয়। এর মাধ্যমে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং যুদ্ধ প্রস্তুতির পরিচয় তুলে ধরা হয়।
লে থেকে দ্রাস মোটরসাইকেল অভিযান
২০২৬ সালের ১২ ও ১৩ জুলাই ভারতীয় সেনাবাহিনীর রাইডাররা লে থেকে দ্রাসের কার্গিল ওয়ার মেমোরিয়াল পর্যন্ত একটি মোটরসাইকেল অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। এই অভিযানে তাঁরা দুর্গম ফতু লা, নামিকা লা এবং উম্বা লা গিরিপথ অতিক্রম করেন। ‘অপারেশন বিজয়’-এর বীর সেনানীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি, এই অভিযান সহনশীলতা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সামরিক চেতনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
এই স্মারক কর্মসূচিগুলি নিশ্চিত করে যে, কার্গিলের উত্তরাধিকার নির্ভীকতা, আত্মত্যাগ এবং মাতৃভূমির সেবার চিরন্তন আদর্শে প্রত্যেক প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলবে।
যে বিজয় আজও অম্লান
সাতাশ বছর পরও কার্গিলের প্রতিধ্বনি আজও সমগ্র দেশজুড়ে অনুরণিত হয়। এই বিজয় সাহস, আত্মত্যাগ এবং অটল দেশপ্রেমের এক চিরন্তন প্রতীক হয়ে রয়েছে। পুনর্দখল করা প্রতিটি শৃঙ্গ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভারতের সার্বভৌমত্ব কোনোভাবেই আপসযোগ্য নয় এবং যে কোনো মূল্যে তা রক্ষা করা হবে। কার্গিলের বীর সেনানীদের অসীম বীরত্বে অনুপ্রাণিত হয়ে ভারত আজ আরও শক্তিশালী, আরও প্রস্তুত এবং ক্রমশ আরও আত্মনির্ভর হয়ে উঠেছে। দেশ যখন কার্গিলের বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়, তখন একই সঙ্গে তাঁদের উত্তরাধিকার রক্ষার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করে। তাঁদের সাহস চিরকাল প্রজন্মের পর প্রজন্মকে সম্মান, কর্তব্যবোধ এবং অটল নিষ্ঠার সঙ্গে দেশের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে অনুপ্রাণিত করবে।
******
তথ্যবিবরণী
PIB Backgrounders:
Ministry of Defence:
Click here to see pdf
SSS/RP........
(रिलीज़ आईडी: 2289337)
आगंतुक पटल : 21