Technology
গ্রীন হাইড্রোজেন
ভারতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রূপান্তরে উদীয়মান স্তম্ভ
Posted On:
02 NOV 2026 4:13PM
২ নভেম্বর, ২০২৬
ভারতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রূপান্তরের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে গ্রীন হাইড্রোজেন উঠে আসছে।
পুনর্নবীকরণযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করে জলকে বিভাজিত করার মাধ্যমে এটি উৎপাদন করা হয়। সার উৎপাদন, পেট্রোলিয়াম পরিশোধন, লোহা ও ইস্পাত উৎপাদন, ভারী যানবাহনের সড়ক পরিবহণ এবং জাহাজ চলাচলের মতো ক্ষেত্রে নির্গমন কমাতে এটি সহায়তা করতে পারে। ন্যাশনাল গ্রীন হাইড্রোজেন মিশন (NGHM) অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও উৎপাদন পরিকাঠামো, সুনিশ্চিত চাহিদা এবং বিশ্বাসযোগ্য শংসাপত্র প্রদানের ব্যবস্থাকে সহায়তা করে। গ্রীন অ্যামোনিয়া নিলাম থেকে শুরু করে ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেন- প্রাথমিক পর্যায়ের প্রকল্পগুলি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কেন গ্রীন হাইড্রোজেন
হাইড্রোজেন একটি শক্তিবাহক, যা শক্তি সঞ্চয় করে এবং বিভিন্ন কাজে তা সরবরাহ করে। ফুয়েল সেলে এটি অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এই প্রক্রিয়ায় উপজাত হিসেবে কেবল জল ও তাপ উৎপন্ন হয়; কোনও দূষণকারী যৌগ বা গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গত হয় না। প্রকৃতিতে বিশুদ্ধ হাইড্রোজেন প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় না, তবে জল বা প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো যৌগ থেকে এটি নিষ্কাশন করা যায়। তাই এর পরিবেশগত প্রভাব নির্ভর করে এটি কিভাবে উৎপাদিত হচ্ছে তার ওপর। প্রচলিত উৎপাদন পদ্ধতিতে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করা হয় এবং কার্বন নির্গমন ঘটে।
সৌর ও বায়ুশক্তি থেকে উৎপাদিত
পুনর্নবীকরণযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করে হাইড্রোজেন উৎপাদন করলে পরিবেশের ওপর এর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে জলকে বিভাজিত করার মাধ্যমে উৎপাদিত হাইড্রোজেনকে গ্রীন হাইড্রোজেন বলা হয়। জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক উৎপাদন পদ্ধতির তুলনায় এই প্রক্রিয়ায় কার্বন নির্গমন অনেক কম হয়। ভারতের বিপুল সৌর ও বায়ুশক্তির উৎস দেশের অভ্যন্তরে গ্রীন হাইড্রোজেন উৎপাদনকে বাস্তবসম্মত করে তুলেছে। এর ফলে দেশের জ্বালানির উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় হয়।
এটি ২০৭০ সালের মধ্যে নেট-জিরো নির্গমনের লক্ষ্য অর্জনেও ভারতকে সহায়তা করে। যেসব ক্ষেত্রে নির্গমন কমানো কঠিন, সেই ক্ষেত্রগুলিতে গ্রীন হাইড্রোজেনের গুরুত্ব বিশেষভাবে বেশি। এর কারণ হল উচ্চ তাপমাত্রার তাপের প্রয়োজনীয়তা, রাসায়নিক প্রক্রিয়া এবং জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্পের সীমিত প্রাপ্যতা। এই ধরনের ক্ষেত্রগুলিকে নির্গমন কমানো কঠিন এমন ক্ষেত্র বলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সার উৎপাদন, পেট্রোলিয়াম পরিশোধন, লোহা ও ইস্পাত উৎপাদন, ভারী যানবাহনের সড়ক পরিবহণ এবং জাহাজ চলাচল। সার উৎপাদন ও তেল পরিশোধন কারখানায় ইতিমধ্যেই হাইড্রোজেন ব্যবহার করা হয়। তাই সেখানে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক হাইড্রোজেনের পরিবর্তে গ্রীন হাইড্রোজেন ব্যবহার করা সম্ভব। কম নির্গমনযুক্ত ইস্পাত উৎপাদন, পরিবহণের নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে এবং শক্তি সঞ্চয়ের কাজেও এটি সহায়ক হতে পারে। বিশেষত যেখানে সরাসরি বিদ্যুতায়ন কঠিন বা কম বাস্তবসম্মত, সেখানে গ্রীন হাইড্রোজেনের ব্যবহার কার্যকর।
হাইড্রোজেনকে ‘গ্রীন’ বলা হয় কেন?
হাইড্রোজেন ব্যবহারের সময় কোনও কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয় না। তাই এর জলবায়ুগত প্রভাব নির্ভর করে এটি কিভাবে উৎপাদিত হচ্ছে তার ওপর। ২০২৩ সালের আগস্টে নতুন ও পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি মন্ত্রক (MNRE) ভারতের গ্রিন হাইড্রোজেন স্ট্যান্ডার্ড বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এই মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি কেজি হাইড্রোজেন উৎপাদনে নির্গমনের পরিমাণ ২ কেজি CO₂ সমতুল্যের বেশি না হলে, ১২ মাসের গড় হিসাবে ওয়েল-টু-গেট ভিত্তিতে, সেই হাইড্রোজেনকে গ্রীন হাইড্রোজেন হিসেবে গণ্য করা হয়। এর ফলে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রীন হাইড্রোজেনের সংজ্ঞা নির্ধারণকারী প্রথম কয়েকটি দেশের মধ্যে স্থান করে নেয়।
ভারতে গ্রীন হাইড্রোজেনের ব্যাপক ব্যবহার আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে। এর ফলে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামার প্রভাবও কমবে। এই ক্ষেত্র উৎপাদন শিল্পে নতুন সুযোগ সৃষ্টি, বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং রপ্তানি সম্প্রসারণে সহায়তা করতে পারে। সমগ্র মূল্যশৃঙ্খল জুড়ে সক্ষমতা গড়ে তোলা দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করবে এবং শিল্পক্ষেত্রে উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে। এইভাবে গ্রীন হাইড্রোজেন আত্মনির্ভরতা, সুস্থায়ী শিল্পোন্নয়ন এবং স্বল্প-কার্বন নির্ভর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে।
ভারত রিনিউয়েবল এনার্জি সামিট অ্যান্ড এক্সপো (ভারত RE) ২০২৬ ২ থেকে ৫ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মূল ভাবনা ‘বিনিয়োগ করুন। উদ্ভাবন করুন। অনুপ্রাণিত করুন।’ চার দিনব্যাপী এই সম্মেলনে ১৩০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ৪০ জনেরও বেশি মন্ত্রী, নীতিনির্ধারক, বিনিয়োগকারী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পক্ষেত্রের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা। নয়টি দেশ—অস্ট্রেলিয়া, ডেনমার্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, সুইডেন এবং যুক্তরাজ্য কান্ট্রি পার্টনার হিসেবে অংশ নিচ্ছে। ভারতের ১৩টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা, বিনিয়োগের সুযোগ এবং পরিচ্ছন্ন উৎপাদন সংক্রান্ত সক্ষমতা তুলে ধরছে। সম্মেলনের মূল আলোচ্য বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে সৌর ও বায়ুশক্তি, গ্রীন হাইড্রোজেন, জ্বালানি সঞ্চয়, গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্তিকরণ, দেশীয় উৎপাদন, ডিজিটালাইজেশন এবং জ্বালানি ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব এবং শিল্পক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য এই সম্মেলন একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ প্রদান করছে। এতে মন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনা, সিইও-দের গোলটেবিল বৈঠক, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং ৪০০-রও বেশি প্রদর্শকের অংশগ্রহণে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নবম আন্তর্জাতিক সৌর জোট সম্মেলন এবং চতুর্থ আন্তর্জাতিক গ্রীন হাইড্রোজেন বিষয়কষসম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেটি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করবে।
গ্রীন হাইড্রোজেন কিভাবে উৎপাদিত হয়?
গ্রীন হাইড্রোজেন মূলত জলের (H₂O) তড়িৎ বিশ্লেষণের মাধ্যমে উৎপাদিত হয়। তড়িৎ বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় বিদ্যুতের সাহায্যে কোনও যৌগকে ভেঙে সরলতর পদার্থে পরিণত করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় পুনর্নবীকরণযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করে জলকে হাইড্রোজেন (H₂) ও অক্সিজেনে (O₂) বিভক্ত করা হয় এবং নির্গমনের পরিমাণ থাকে ন্যূনতম।
এই প্রক্রিয়ার প্রধান যন্ত্রটি হল ইলেকট্রোলাইজার। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহের উৎসের সঙ্গে যুক্ত দুটি ইলেকট্রোড থাকে- একটি ক্যাথোড এবং অন্যটি অ্যানোড। এগুলি একটি ইলেকট্রোলাইটের মধ্যে কাজ করে, যা সেলের মধ্যে আয়ন চলাচলে সহায়তা করে। একটি ডায়াফ্রাম আয়ন চলাচলের সুযোগ রেখে গ্যাস দুটিকে পৃথক রাখে। বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে ক্যাথোডে হাইড্রোজেন এবং অ্যানোডে অক্সিজেন উৎপন্ন হয়। পরবর্তী ব্যবহারের জন্য গ্যাস দুটিকে আলাদাভাবে সংগ্রহ করা হয়। এইভাবে ইলেকট্রোলাইজার পুনর্নবীকরণযোগ্য বিদ্যুৎ ও জলকে শিল্প, পরিবহণ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী স্বল্প-নির্গমনকারী জ্বালানিতে রূপান্তরিত করে।
আপনি কি জানেন?
তড়িৎ বিশ্লেষণের আগে জল পরিশোধন করা হয়, কারণ জলের অশুদ্ধি সেলের ক্ষতি করতে পারে এবং এর কার্যকাল কমিয়ে দিতে পারে। MNRE-র তথ্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি হাইড্রোজেন উৎপাদনের জন্য প্রায় ৯ লিটার খনিজমুক্ত জলের প্রয়োজন হয়। এরপর হাইড্রোজেনকে সংকুচিত করার আগে শুকিয়ে ও পরিশোধন করা হয়। ভারতের গ্রীন হাইড্রোজেন স্ট্যান্ডার্ডে এই প্রতিটি ধাপের নির্গমন হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গ্রীন হাইড্রোজেনের ব্যবহার
সার:
হাইড্রোজেন ও নাইট্রোজেন থেকে উৎপাদিত অ্যামোনিয়া ইউরিয়ার মতো নাইট্রোজেন-ভিত্তিক সারের মূল উপাদান। বর্তমানে এই হাইড্রোজেনের অধিকাংশই প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে পাওয়া যায়। এর পরিবর্তে গ্রীন হাইড্রোজেন ব্যবহার করলে অনেক কম নির্গমনের মাধ্যমে গ্রীন অ্যামোনিয়া উৎপাদন করা সম্ভব।
পেট্রোলিয়াম শোধনাগার:
পেট্রোল ও ডিজেল থেকে সালফার অপসারণের জন্য শোধনাগারগুলিতে হাইড্রোজেন ব্যবহার করা হয়, যাতে জ্বালানিগুলি আরও পরিচ্ছন্নভাবে দহন করতে পারে। ভারী তেলকে ডিজেল, এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল এবং ন্যাফথার মতো অপেক্ষাকৃত হালকা জ্বালানিতে রূপান্তর করতেও হাইড্রোজেন ব্যবহৃত হয়। এই জ্বালানিগুলি সড়ক পরিবহণ, বিমান পরিবহণ এবং শিল্পক্ষেত্রে কাজে লাগে। শোধনাগারগুলিতে ব্যবহৃত হাইড্রোজেনের অধিকাংশই জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপাদিত হয়। তাই গ্রীন হাইড্রোজেনের সরবরাহ শোধন প্রক্রিয়ায় নির্গমন কমাতে পারে।
ইস্পাত: প্রচলিত ইস্পাত উৎপাদন প্রক্রিয়ায় লৌহ আকরিক থেকে অক্সিজেন অপসারণের জন্য কয়লা ব্যবহার করা হয়, যার ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। ডাইরেক্ট রিডিউসড আয়রন পদ্ধতিতে এর পরিবর্তে গ্রীন হাইড্রোজেন ব্যবহার করা যেতে পারে। এই ক্ষেত্রে বিজারণ প্রক্রিয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিবর্তে জলীয় বাষ্প নির্গত হয়।
সিটি গ্যাস নেটওয়ার্ক: নিরাপত্তা সংক্রান্ত মানদণ্ড এবং পরিকাঠামোর সামঞ্জস্য বজায় রেখে সীমিত অনুপাতে প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে গ্রীন হাইড্রোজেন মেশানো যেতে পারে। এর ফলে, চলতি গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে বাড়ি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পক্ষেত্রে হাইড্রোজেন ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মিশ্রণ সরবরাহ করা সম্ভব। চলতি বণ্টন পরিকাঠামো ব্যবহার করেই এই মিশ্রণ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট নির্গমন কমাতে পারে।
সড়ক ও রেল পরিবহণ:
ফুয়েল সেলচালিত যানবাহনে গাড়ির মধ্যেই হাইড্রোজেনকে বিদ্যুতে রূপান্তর করা হয়, যা বৈদ্যুতিক মোটর চালায়। ব্যবহারের সময় এই যানবাহনগুলি থেকে একমাত্র নির্গমন হল জলীয় বাষ্প। দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে হয় এবং দ্রুত জ্বালানি ভরার প্রয়োজন হয়—এমন বাস, ট্রাক ও ট্রেনের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি উপযোগী।
আপনি কি জানেন?
ভারতের প্রথম দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হাইড্রোজেনচালিত ট্রেনটি এ বছর ১৭ জুলাই জিন্দ–সোনিপত রেলপথে উদ্বোধন করা হয়। উল্লেখ্য, ১০টি কোচবিশিষ্ট এই ট্রেনটিতে প্রায় ২,৬০০ জন যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন। জিন্দে অবস্থিত একটি পরিকাঠামো কেন্দ্রে প্রায় ৩,০০০ কেজি হাইড্রোজেন মজুত করা হয়। ট্রেনটি থেকে শুধুমাত্র জলীয় বাষ্প ও তাপ নির্গত হয়।
জাহাজ পরিবহণ: গ্রীন হাইড্রোজেনকে গ্রীন অ্যামোনিয়া ও গ্রীন মিথানলে রূপান্তর করা যায়, যা জাহাজের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় এগুলি প্রচলিত সামুদ্রিক জ্বালানির বিকল্প হতে পারে। তবে এর ব্যবহার নির্ভর করে ইঞ্জিনের সঙ্গে সামঞ্জস্য, সুরক্ষা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তা এবং বন্দরের পরিকাঠামোর ওপর।
রপ্তানি: স্বল্প-নির্গমনকারী জ্বালানির সন্ধান করছে এমন দেশগুলিকে ভারত গ্রীন হাইড্রোজেন এবং এর থেকে উৎপাদিত গ্রীন অ্যামোনিয়া ও গ্রীন মিথানলের মতো পণ্য সরবরাহ করতে পারে। ভারতের পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানির সম্পদ এই সরবরাহে সহায়তা করতে পারে। রপ্তানির মাধ্যমে শিল্পক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং স্বল্প-নির্গমনকারী জ্বালানির ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
সরকারি উদ্যোগে সমন্বয় সাধন
বিভিন্ন ক্ষেত্রে গ্রীন হাইড্রোজেনের ব্যবহার বাড়াতে সরকার একটি সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করেছে। এর ব্যবহার প্রসারে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্তরের বিভিন্ন মন্ত্রক, বিভাগ, সংস্থা এবং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। প্রতিটি মন্ত্রকের নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক শোধনাগার এবং সিটি গ্যাস বণ্টন ব্যবস্থায় এর ব্যবহার প্রসারে উদ্যোগী; রাসায়নিক ও সার মন্ত্রক দেশীয় প্রযুক্তিতে গ্রীন অ্যামোনিয়া-ভিত্তিক সার উৎপাদনে উৎসাহ জোগায়; সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রক বিধি, মানদণ্ড ও বিধিবদ্ধ নির্দেশিকার মাধ্যমে পরিবহণ ক্ষেত্রে এর ব্যবহার সম্ভব করে তোলে; ইস্পাত মন্ত্রক ইস্পাত উৎপাদনে এর ব্যবহার প্রসারে উদ্যোগী; এবং বিদেশ মন্ত্রক আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা সহজতর করে।
ভারতের গ্রীন হাইড্রোজেন বিষয়ক নীতি কাঠামো
NGHM: সমগ্র ব্যবস্থার জন্য একটি মিশন
গ্রীন হাইড্রোজেন এবং এর উপজাত পণ্যের ক্ষেত্রে ভারতকে একটি আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে MNRE জাতীয় গ্রীন হাইড্রোজেন মিশন (NGHM) বাস্তবায়ন করছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ১৯,৭৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ-সহ এই মিশনে অনুমোদন দেয়। ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক অন্তত ৫০ লক্ষ মেট্রিক টন (MMT) উৎপাদন ক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। রপ্তানির চাহিদা বিবেচনায় এই পরিমাণ বছরে ১ কোটি মেট্রিক টনে পৌঁছতে পারে। এই মিশনের উপাদানগুলি হল:
SIGHT: বাজারের উভয় দিকেই সহায়তা
স্ট্র্যাটেজিক ইন্টারভেনশনস ফর গ্রীন হাইড্রোজেন ট্রানজিশন (SIGHT) কর্মসূচি হল NGHM-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ২০২৯–৩০ সাল পর্যন্ত এই কর্মসূচিতে ১৭,৪৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। দুটি উদ্দেশ্যে এই কর্মসূচির আওতায় আর্থিক প্রোৎসাহন দেওয়া হয়—দেশীয় ইলেকট্রোলাইজার উৎপাদন এবং গ্রীন হাইড্রোজেন উৎপাদন। এই দুই উদ্যোগ একসঙ্গে দেশীয় সক্ষমতা শক্তিশালী করার পাশাপাশি, উৎপাদনের গতি বাড়ায়।
উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি
বছরে ৩,০০০ মেগাওয়াট ইলেকট্রোলাইজার উৎপাদন ক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য ১৫টি সংস্থাকে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আমদানিনির্ভর সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরতা কমবে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে বছরে প্রায় ৮,০০০ টন গ্রীন হাইড্রোজেন উৎপাদন ক্ষমতা চালু করা হয়েছিল।
বছরে ৮,৬২,০০০ টন গ্রীন হাইড্রোজেন উৎপাদন ক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।
২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ভারতীয় সংস্থাগুলি বিশ্বের বৃহত্তম গ্রীন হাইড্রোজেন ক্রয়-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিতে স্বাক্ষর করেছে, যার মোট পরিমাণ বার্ষিক ৫.৫ লক্ষ মেট্রিক টনেরও বেশি (MTPA)। এর ফলে, গ্রীন হাইড্রোজেন সরবরাহের প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে ভারত বিশ্বে নেতৃত্বস্থানীয় অবস্থানে রয়েছে।
পাইলট প্রকল্প
যেসব ক্ষেত্রে কার্বন নির্গমন কমানো কঠিন, সেই সব ক্ষেত্রে জীবাশ্ম জ্বালানি ও কাঁচামালের পরিবর্তে বিকল্প ব্যবহারের লক্ষ্যে NGHM-এর আওতায় পাইলট প্রকল্পগুলিকে সহায়তা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ইস্পাত উৎপাদন, ভারী যানবাহন পরিবহণ এবং জাহাজ পরিবহণ। এই পাইলট প্রকল্পগুলির উদ্দেশ্য হল- প্রযুক্তিগত, নিয়ন্ত্রক এবং পরিকাঠামোগত ঘাটতিগুলি চিহ্নিত করা। পাশাপাশি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং প্রযুক্তির সমন্বয়ও পরীক্ষা করা হবে। প্রকল্পগুলি থেকে প্রাপ্ত ফলাফল বাণিজ্যিক স্তরে এই প্রযুক্তির ব্যবহার এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার দিশা দেখাবে। ২০২৯–৩০ সাল পর্যন্ত স্বল্প-কার্বন নির্ভর ইস্পাত উৎপাদনের জন্য এই মিশনে ৪৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়া, ২০২৫–২৬ সাল পর্যন্ত পরিবহণ ক্ষেত্রে ৪৯৬ কোটি টাকা এবং জাহাজ পরিবহণ ক্ষেত্রে ১১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি
ইস্পাত ক্ষেত্রে পাঁচটি পাইলট প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। বস্তুত, ১০০ শতাংশ হাইড্রোজেন ইনজেকশন পরীক্ষা করার জন্য ৮৪ কোটি টাকা অনুমোদন করা হয়েছে।
মোট ১২টি প্রকল্পের আওতায় ৭০টি হাইড্রোজেনচালিত যানবাহন চালু করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ২৭টি বাস এবং ৪৩টি ট্রাক। এই যানবাহনগুলির মধ্যে ফুয়েল সেল ইলেকট্রিক ভেহিকল (FCEV) এবং হাইড্রোজেন ইন্টারনাল কমবাসশন ইঞ্জিন (H₂-ICE) চালিত যানবাহনও রয়েছে।
এই প্রকল্পগুলির আওতায় ২১টি রুটে ১৬টি হাইড্রোজেন রিফুয়েলিং স্টেশনও গড়ে তোলা হবে। এর জন্য ৪১.৫৮ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
গ্রীন মিথানলের জন্য বাঙ্কারিং ও রিফুয়েলিং পরিকাঠামো গড়ে তুলতে ভি.ও. চিদাম্বরনার বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি পাইলট প্রকল্পের বরাত দিয়েছে। এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ৩৮.১২ কোটি টাকা, যার মধ্যে MNRE-র ৩৫ কোটি টাকার অনুদান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
গ্রীন হাইড্রোজেন হাব এবং হাইড্রোজেন ভ্যালি ইনোভেশন ক্লাস্টার (HVIC)
হাইড্রোজেন পরিবহণ করা কঠিন। এই সমস্যার সমাধানে মিশনের আওতায় হাব এবং HVIC গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ক্লাস্টার-ভিত্তিক পদ্ধতিতে উৎপাদন, ব্যবহার এবং পরিকাঠামোকে একই জায়গায় নিয়ে আসা হয়। এর ফলে প্রকল্পের কার্যকারিতা বাড়ে এবং বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনের সুবিধা পাওয়া যায়। নির্দিষ্ট হাবগুলিতে গড়ে ওঠা প্রকল্পগুলি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধাও পেতে পারে। হাব এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলির জন্য ২০২৫–২৬ সাল পর্যন্ত এই মিশনে ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এই উদ্যোগগুলির লক্ষ্য হল গ্রীন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং উদ্ভাবনের গতি বাড়ানো।
উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি
দীনদয়াল বন্দর (কাণ্ডলা, গুজরাট), ভি.ও. চিদাম্বরনার বন্দর (তুতিকোরিন, তামিলনাড়ু) এবং পারাদ্বীপ বন্দরকে (ওড়িশা) MNRE হাব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে কাণ্ডলা বন্দরে দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত ১ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি গ্রীন হাইড্রোজেন প্ল্যান্ট চালু করা হয়।
যোধপুর, ওড়িশা, পুনে এবং কেরালায় চারটি HVIC প্রকল্পের বরাত দেওয়া হয়েছে।
সহায়ক নীতিগত কাঠামো
গ্রীন হাইড্রোজেনকে সাশ্রয়ী করে তুলতে এই মিশনে সরকারের সমস্ত স্তরের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন সুবিধা প্রদান এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজতর করার জন্য MNRE কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হল আন্তঃরাজ্য বিদ্যুৎ সঞ্চালন মাশুল মকুব এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য বিদ্যুতের ব্যাঙ্কিংয়ের ব্যবস্থা করা। এছাড়া, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ওপেন অ্যাক্সেস এবং গ্রিড সংযোগের সুবিধা প্রদানও এর অন্তর্ভুক্ত। পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ক্ষমতা, বিদ্যুৎ সঞ্চালন, ব্যাঙ্কিং এবং সঞ্চয় সংক্রান্ত পরিকল্পনায় সরকার সমন্বয় সাধন করবে। সোলার পার্ক, উৎপাদন অঞ্চল এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ)-এর সুবিধা হাইড্রোজেন উৎপাদন পরিকাঠামোতেও সম্প্রসারিত করা যেতে পারে। এই মিশনের আওতায় আন্তর্জাতিক গ্রীন ফিনান্স, গ্রীন বন্ড এবং উদ্ভাবনী অর্থায়নের ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখা হবে।
উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি
২০৩০ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে চালু হওয়া গ্রীন হাইড্রোজেন এবং গ্রীন অ্যামোনিয়া প্ল্যান্টগুলিকে ২৫ বছরের জন্য ইন্টার-স্টেট ট্রান্সমিশন সিস্টেম (ISTS) মাশুল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ISTS হল রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য প্রদেয় মাশুল। এই মাশুল মকুবের ফলে বিদ্যুতের খরচ কমবে।
গ্রিন এনার্জি করিডর প্রকল্প-এর আওতায় পুনর্নবীকরণযোগ্য বিদ্যুৎ গ্রিডে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং সাবস্টেশন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়তা করা হয়। একটি জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন পরিকল্পনা বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারের কেন্দ্রগুলির মধ্যে সংযোগ আরও উন্নত করে।
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন, ২০০৫-এর ২৬ নম্বর ধারার অধীনে শুল্ক সংক্রান্ত সুবিধা সেই সমস্ত যোগ্য ইউনিটের ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত করা হয়েছে, যারা শুধুমাত্র নিজস্ব ব্যবহারের জন্য পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম স্থাপন ও পরিচালনা করে। এর ফলে, SEZ-এর মধ্যে নিজস্ব বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি পরিকাঠামো গড়ে তোলার খরচ কমতে পারে।
পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে জলের তড়িৎ বিশ্লেষণের মাধ্যমে গ্রীন হাইড্রোজেন বা গ্রীন অ্যামোনিয়া উৎপাদনকারী স্বতন্ত্র প্ল্যান্টগুলিকে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বিজ্ঞপ্তি, ২০০৬-এর অধীনে আগাম পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে যোগ্য প্রকল্পগুলির অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে।
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) বা রপ্তানিমুখী ইউনিটের (EOU) মধ্যে অবস্থিত পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি প্ল্যান্টগুলি শুধুমাত্র গ্রীন হাইড্রোজেন উৎপাদনকারী প্ল্যান্ট বা এর উপজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্ল্যান্টে বিদ্যুৎ সরবরাহ করলে অ্যাপ্রুভড লিস্ট অফ মডেলস অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স (ALMM) এবং রিভাইজড লিস্ট অফ মডেলস অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স (RLMM)-এর শর্তাবলী থেকে অব্যাহতি পাবে। প্রযোজ্য অব্যাহতির শর্ত সাপেক্ষে, এর ফলে, যোগ্য প্রকল্পগুলি পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম সংগ্রহের ক্ষেত্রে আরও বেশি নমনীয়তা পাবে।
গ্রীন হাইড্রোজেন ও গ্রীন অ্যামোনিয়া নীতিতে প্রযোজ্য বিধান সাপেক্ষে ১৫ দিনের মধ্যে ওপেন অ্যাক্সেস এবং সর্বোচ্চ ৩০ দিন পর্যন্ত অতিরিক্ত পুনর্নবীকরণযোগ্য বিদ্যুতের ব্যাঙ্কিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ওপেন অ্যাক্সেসের মাধ্যমে উৎপাদকরা তাঁদের স্থানীয় বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থা ছাড়াও অন্য উৎস থেকে পুনর্নবীকরণযোগ্য বিদ্যুৎ সংগ্রহ করতে পারেন। ব্যাঙ্কিংয়ের মাধ্যমে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎকে ক্রেডিট হিসেবে জমা রেখে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে ব্যবহার করা যায়।
হাইড্রোজেনের সঞ্চয় ও সুরক্ষা
হাইড্রোজেন সবচেয়ে হালকা মৌল এবং এটি সহজেই দহনশীল[3]। তাই এর সঞ্চয়, ব্যবহার ও লিকেজ শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড মেনে চলা প্রয়োজন[4]। শিল্পক্ষেত্রে নিরাপদ ব্যবহারের দিশা দেখাতে ভারত গ্রীন হাইড্রোজেন, গ্রীন অ্যামোনিয়া এবং গ্রীন মিথানলের জন্য মানদণ্ড বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে [৫]।
নিয়মকানুন ও মানদণ্ড
শিল্পক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই মিশনের আওতায় নিয়মকানুন ও মানদণ্ড গড়ে তোলা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হল এই ক্ষেত্রের বিকাশে সহায়তা করা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা।
উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি
ভারতের গ্রীন হাইড্রোজেন স্ট্যান্ডার্ড বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। এই মানদণ্ডে ১২ মাসের গড় হিসাবে ওয়েল-টু-গেট ভিত্তিতে প্রতি কেজি হাইড্রোজেন উৎপাদনে নির্গমনের সর্বোচ্চ সীমা ২ কেজি CO₂ সমতুল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে একটি অভিন্ন মানদণ্ড তৈরি হয়েছে।
পরীক্ষার পরিকাঠামো, অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো এবং মানদণ্ডের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে অর্থায়ন সংক্রান্ত প্রকল্পের নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে।
গ্রীন অ্যামোনিয়া এবং গ্রীন মিথানলের জন্য মানদণ্ডের বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। এতে নির্গমনের সীমা এবং যোগ্যতার শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে, যা উৎপাদন ও বাণিজ্যে সহায়তা করবে।
MNRE ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ভারতের গ্রীন হাইড্রোজেন সার্টিফিকেশন স্কিম চালু করে। ব্যুরো অফ এনার্জি এফিশিয়েন্সি (BEE) পর্যবেক্ষণ, যাচাই এবং শংসাপত্র প্রদানের জন্য সংস্থাগুলিকে স্বীকৃতি দেয়।
স্বচ্ছ শংসাপত্র প্রদান এবং নিয়ম মেনে চলা নিশ্চিত করতে ২০২৬ সালের জুন মাসে একটি বিশেষ পোর্টাল চালু করা হয়েছে। বিশ্বাসযোগ্য শংসাপত্র ভারতীয় উৎপাদকদের আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সহায়তা করবে।
গবেষণা ও উন্নয়ন
গ্রীন হাইড্রোজেনকে আরও সাশ্রয়ী, দক্ষ, নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য করে তুলতে এই মিশনের আওতায় গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) সহায়তা করা হচ্ছে। স্ট্র্যাটেজিক হাইড্রোজেন ইনোভেশন পার্টনারশিপ (SHIP) হল একটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের কাঠামো, যার আওতায় শিল্পক্ষেত্র এবং সরকারের পক্ষ থেকে গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য একটি নির্দিষ্ট তহবিল রয়েছে। মোট ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ-সহ R&D সংক্রান্ত প্রকল্পের নির্দেশিকা ২০২৪ সালের মার্চ মাসে বিজ্ঞপ্তি জারি করে প্রকাশ করা হয়। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ১১৩ কোটি টাকার প্রাথমিক R&D রোডম্যাপের আওতায় হাইড্রোজেন উৎপাদন, সঞ্চয় এবং সুরক্ষা প্রযুক্তি সংক্রান্ত অনুমোদিত প্রকল্পগুলিতে সহায়তা করা হচ্ছে।
দক্ষতা উন্নয়ন
সমন্বিতভাবে দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সমগ্র মূল্যশৃঙ্খল জুড়ে ৬ লক্ষেরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে এই মিশন। এখনও পর্যন্ত ১৪টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে হাইড্রোজেন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে ৮,১৪৯ জন প্রার্থীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং ৭,২৪৮ জনকে শংসাপত্র প্রদান করা হয়েছে।
ইলেকট্রোলাইজারের জন্য পুনর্নবীকরণযোগ্য বিদ্যুৎ, তড়িৎ বিশ্লেষণ, সঞ্চয়, পরিবহণ, সুরক্ষা সংক্রান্ত মানদণ্ড এবং ইস্পাত উৎপাদন, পরিবহণ ও শোধনাগারের মতো ক্ষেত্রে এর ব্যবহার- প্রশিক্ষণের আওতায় এই বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে গ্রীন হাইড্রোজেন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা স্টার্ট-আপগুলির জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে নয়টি স্টার্ট-আপকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যাদের জন্য মোট ২২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
প্রযুক্তির বিকাশ, বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বাজার গড়ে তোলা এবং মানদণ্ডের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের লক্ষ্যে এই মিশনের আওতায় বিভিন্ন অংশীদারিত্বকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি
MNRE সরাসরি অথবা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ সোলার এনার্জির মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী (UAE) এবং উজবেকিস্তানের সঙ্গে সমঝোতাপত্র (MoU), অভিপ্রায়পত্র (Letter of Intent) অথবা যৌথ অভিপ্রায় ঘোষণা (Joint Declaration of Intent) স্বাক্ষর করেছে।
নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি সংক্রান্ত একটি সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে।
স্ট্র্যাটেজিক ক্লিন এনার্জি পার্টনারশিপের আওতায় ভারত–মার্কিন হাইড্রোজেন টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে।
ভারত–মার্কিন নিউ অ্যান্ড এমার্জিং রিনিউয়েবল এনার্জি টেকনোলজি অ্যাকশন প্ল্যাটফর্ম (RETAP)-এর অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হল গ্রীন হাইড্রোজেন।
রাজ্যস্তরের উদ্যোগ
জাতীয় গ্রীন হাইড্রোজেন মিশনের পরিপূরক হিসেবে ছয়টি রাজ্য গ্রীন হাইড্রোজেন সংক্রান্ত পৃথক নীতি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। গুজরাট, অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান এবং পশ্চিমবঙ্গ এই রাজ্যগুলির মধ্যে রয়েছে।
আরও চারটি রাজ্য তাদের পৃথক গ্রীন হাইড্রোজেন নীতি চূড়ান্ত করার কাজ করছে। হরিয়ানা, পাঞ্জাব, বিহার এবং কেরল এই নীতিগুলির খসড়া তৈরির কাজ করছে।
সাতটি রাজ্য তাদের বিদ্যমান শিল্প ও পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি নীতির কাঠামোর মধ্যে হাইড্রোজেনকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই রাজ্যগুলির মধ্যে রয়েছে হিমাচল প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা, তেলেঙ্গানা এবং ছত্তিশগড়।
আগামীর পথ
একটি পরিচ্ছন্ন, আরও আত্মনির্ভর এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক জ্বালানি অর্থনীতি গড়ে তোলার পথে জাতীয় গ্রীন হাইড্রোজেন মিশন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত বার্ষিক ৫০ লক্ষ মেট্রিক টন (MMT) গ্রীন হাইড্রোজেন উৎপাদন ক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। এই রূপান্তরের ফলে আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই মিশনের ফলে জীবাশ্ম জ্বালানির ক্রমপুঞ্জিত আমদানি ব্যয় প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি, এই মিশনের লক্ষ্য হল, শিল্পের বিকাশ, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা। এর মাধ্যমে ৮ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং উৎপাদন, পরিকাঠামো, গবেষণা ও প্রকল্প উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৬ লক্ষেরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশা করা হচ্ছে। নির্ধারিত পরিমাণে গ্রীন হাইড্রোজেন উৎপাদন ও ব্যবহারের ফলে প্রতি বছর প্রায় ৫ কোটি মেট্রিক টন (MMT) কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন এড়ানো সম্ভব হতে পারে। এই উদ্যোগগুলির মাধ্যমে সরকার শিল্পক্ষেত্রে কার্বন নির্গমন হ্রাসের গতি বাড়ানো, দেশীয় উৎপাদনকে মজবুত করা এবং গ্রীন হাইড্রোজেন উৎপাদন, ব্যবহার ও রপ্তানির ক্ষেত্রে ভারতকে একটি আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়েছে। এর ফলে ২০৪৭ সালের মধ্যে বিকশিত ভারত গড়ে তোলার বৃহত্তর ভাবনা এবং ২০৭০ সালের মধ্যে নিট-শূন্য নির্গমন অর্জনের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সহায়তা মিলবে।
তথ্যবিবরণী
Cabinet
Ministry of New and Renewable Energy (MNRE)
Ministry of Chemicals and Fertilisers
Ministry of Ports, Shipping and Waterways
Ministry of Railways
Ministry of Power
Ministry of Petroleum and Natural Gas (HPCL)
Ministry of Science and Technology (CSIR)
Parliament of India
Press Information Bureau (PIB)
Other sources
Click to see pdf
*******
SSS/RP.......
(Explainer ID: 160701)
आगंतुक पटल : 5
Provide suggestions / comments