Technology
ভারতের মহাকাশ যাত্রা
Posted On:
21 JUN 2026 2:51PM
২১ জুন, ২০২৬
একটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ শক্তির উত্থান
বিগত ১২ বছরে ভারতের মহাকাশ কর্মসূচি জাতীয় আত্মবিশ্বাস, প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছে। 'আত্মনির্ভর ভারত' এবং 'মেক ইন ইন্ডিয়া' উদ্যোগের মাধ্যমে দেশ একটি শীর্ষস্থানীয় মহাকাশ শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এই রূপান্তরটি তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে— মিশনের মাধ্যমে মহাকাশ সক্ষমতা বৃদ্ধি, শাসন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য জাতীয় সক্ষমতা তৈরি এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সহযোগী হিসাবে ভারতের অবস্থানকে দৃঢ় করা।
১. পৃথিবীর বাইরে ভারতের মহাকাশ সক্ষমতা (India’s Space Capability)
গত এক দশকে ভারত গভীর মহাকাশ অনুসন্ধান, মানব মহাকাশ যাত্রা এবং কক্ষপথের পরিকাঠামো উন্নয়নে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে:
* *চন্দ্র অভিযান (চন্দ্রযান প্রোগ্রাম):*
২০০৮ সালে চন্দ্রযান-১ চাঁদের পৃষ্ঠে জলের অণু আবিষ্কার করে আন্তর্জাতিক মহাকাশ বিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটায়। ২০১৯ সালের চন্দ্রযান-২ উচ্চ-বিশ্লেষণধর্মী ছবি সরবরাহ করে। এই ধারাবাহিকতার ফলশ্রুতিতে ২৩ আগস্ট ২০২৩ তারিখে চন্দ্রযান-৩ চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে সফলভাবে 'সফট ল্যান্ডিং' করে ইতিহাস সৃষ্টি করে, যার মাধ্যমে ভারত বিশ্বের প্রথম দেশ হিসাবে এই কৃতিত্ব অর্জন করে। ২০২৭ সালের জন্য চন্দ্রযান-৪ (নমুনা সংগ্রহ ও পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন) এবং পরবর্তীতে জাপানের সঙ্গে যৌথভাবে চন্দ্রযান-৫/LUPEX মিশনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
* *মঙ্গলযান (Mars Orbiter Mission):*
২০১৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ভারত তার প্রথম প্রচেষ্টাতেই সফলভাবে মঙ্গল গ্রহে পৌঁছানো প্রথম দেশ হয়ে ওঠে। মাত্র ছয় মাসের জন্য পরিকল্পিত এই যানটি আট বছরেরও বেশি সময় ধরে বৈজ্ঞানিক তথ্য সরবরাহ করেছে।
* *আদিত্য-এল১ (Aditya-L1):*
২০২৩ সালে চালু হওয়া এটি ভারতের প্রথম সূর্য পর্যবেক্ষণ মিশন। এটি পৃথিবী থেকে ১.৫ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে হ্যালো কক্ষপথে থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে সৌর করোনা ও মহাকাশের আবহাওয়া অধ্যয়ন করছে এবং ইতিমধ্যে ২৭ টেরাবাইটেরও বেশি তথ্য প্রদান করেছে।
* *মহাকাশ জ্যোতির্বিদ্যা ও স্পেস ডকিং:*
'অ্যাস্ট্রোস্যাট' এবং ২০২৪ সালে উৎক্ষেপিত 'এক্সপোস্যাট' এক্স-রে জ্যোতির্বিদ্যায় ভারতের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ভারত SPADEX মিশনের মাধ্যমে মহাকাশে স্বয়ংক্রিয় ডকিং ও আনডকিং প্রযুক্তির সফল প্রদর্শন করেছে, যা ভারতের নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন নির্মাণের পথ প্রশস্ত করেছে।
* *শুক্রযান (Venus Orbiter Mission):*
২০২৮ সালের মার্চ মাসে শুক্র গ্রহের ভূতত্ত্ব ও বায়ুমণ্ডল অধ্যয়নের জন্য এই মিশনটি চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
* *গগনযান ও জাতীয় মহাকাশ স্টেশন:*
ভারতের প্রথম মানব মহাকাশ কর্মসূচি 'গগনযান' ২০২৫ সালে তার চূড়ান্ত পর্বে প্রবেশ করেছে। এর প্রস্তুতি হিসেবে ২০২৫ সালে আইএসআরও-নাসা সমর্থিত এক্সিয়ম-৪ (Axiom-4) মিশনের অংশ হিসাবে গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্লা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে গিয়ে মাইক্রোগ্রাভিটি পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। ২০৪৭ সালের মহাকাশ ভিশনের অংশ হিসাবে ভারত ভারতীয় অন্তরীক্ষ স্টেশন (BAS) স্থাপন করতে যাচ্ছে, যার প্রথম মডিউল (BAS-01) ২০২৮ সালের মধ্যে উৎক্ষেপণ করা হবে।
২. বেসরকারি অংশগ্রহণ, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে সক্ষমতা বৃদ্ধি
ভারত মহাকাশ ক্ষেত্রকে সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে এনে একটি প্রাণস্পন্দিত ক্ষেত্রে রূপান্তরিত করেছে:
* *বেসরকারি ক্ষেত্রের ক্ষমতায়ন:*
২০২০ সালে বেসরকারি অংশীদারিত্বের জন্য দ্বার উন্মোচন এবং 'ভারতীয় মহাকাশ নীতি ২০২৩'-এর পর এই ক্ষেত্রে এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। ২০১৪ সালে ভারতে মাত্র একটি নিবন্ধিত মহাকাশ স্টার্টআপ ছিল, যা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৪০০ ছাড়িয়ে গেছে। পিক্সেল, স্কাইরুট এবং অগ্নিকুলের মতো সংস্থাগুলি এতে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
* *উদারীকৃত এফডিআই ফা প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (FDI) নীতি:*
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মহাকাশ ক্ষেত্রে ১০০% পর্যন্ত সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের (FDI) অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর অধীনে স্যাটেলাইট বা উপগ্রহ উৎপাদনে ৭৪% এবং রকেট উৎক্ষেপণ পরিকাঠামো ক্ষেত্রে ৪৯% পর্যন্ত বিনিয়োগ করা যাবে।
* *বাণিজ্যিকীকরণ:*
ভারতের মহাকাশ অর্থনীতি বর্তমানে $৮ বিলিয়ন মূল্যের। ২০৩০ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক মহাকাশ অর্থনীতিতে ভারতের অংশীদারিত্ব ৮%-এ উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত 'নিউস্পেস ইন্ডিয়া লিমিটেড' (NSIL) এর রাজস্ব ২০২১-২২ সালের ₹৩২১.৭৭ কোটি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪-২৫ সালে ₹৩,২৪৬.০৯ কোটি টাকা হয়েছে।
* *স্বনির্ভর মহাকাশ পরিবহণ ও উৎক্ষেপণ পরিকাঠামো:*
বর্তমানে পিএসএলভি, জিএসএলভি এবং এলভিএম৩ এর মাধ্যমে ভারত ১০ টন পর্যন্ত পণ্য লো আর্থ অরবিটে পাঠাতে সক্ষম। ভবিষ্যৎ ভিশনের জন্য ৩০ টন সক্ষমতার 'নেক্সট জেনারেশন লঞ্চ ভেহিকেল' (NGLV) এবং পুনঃব্যবহারযোগ্য রকেট (RLV) প্রযুক্তি তৈরি করা হচ্ছে। তামিলনাড়ুর কুলাশেকারাপত্তনমে ভারতের দ্বিতীয় স্পেসপোর্ট তৈরি হচ্ছে এবং শ্রীহরিকোটায় চতুর্থ লঞ্চ প্যাডের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
* *স্বদেশী বৈদ্যুতিন ব্যবস্থা:*
সেমিকন্ডাক্টর ল্যাবরেটরির সঙ্গে যৌথভাবে ভারত 'বিক্রম৩২০১' (VIKRAM3201) নামক প্রথম সম্পূর্ণ স্বদেশী ৩২-বিট স্পেস মাইক্রোপ্রসেসর তৈরি করেছে।
৩. আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতীয় মহাকাশ ক্ষেত্রের নির্ভরযোগ্যতা
২০১৪ সালের আগে ভারত মাত্র ৩৫টি বিদেশী উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করেছিল, যা ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়ে ৩৯৯টি বিদেশী উপগ্রহ উৎক্ষেপণে পৌঁছেছে। বর্তমানে ৬১টি দেশের সঙ্গে ভারতের ৩০০টিরও বেশি সহযোগিতা চুক্তি রয়েছে।
* *আঞ্চলিক নেতৃত্ব (BIMSTEC):*
ভারত তার 'প্রতিবেশী প্রথম' নীতির অংশ হিসাবে বিমস্টেক মহাকাশ কর্মসূচির নেতৃত্ব দিচ্ছে, যেখানে দুর্যোগ মোকাবিলা ও জলবায়ু পূর্বাভাসের জন্য উপগ্রহ তথ্য ভাগ করে নেওয়া হয়।
* *ভারত-রাশিয়া অংশীদারিত্ব:*
গগনযান মিশনের জন্য রাশিয়ার নভোচরদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করেছে।
* ইসরো এবং নাসা (NASA):*
যৌথভাবে তৈরি নিসার (NISAR) মিশনটি ২০২৫ সালের ৩০ জুলাই জিএসএলভি-এফ১৬ রকেটের মাধ্যমে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে, যা পৃথিবীর ভূমি ও মহাসাগরের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করছে।
* *আইএসআরও এবং ফ্রান্স (CNES):*
২০২৬ সালে উৎক্ষেপণের জন্য যৌথভাবে পরিবেশ ও কৃষি পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে 'তৃষ্ণা' (TRISHNA) উপগ্রহ তৈরি করা হচ্ছে।
* *আইএসআরও এবং জাপান (JAXA):*
২০২৭-২৮ সালের চন্দ্রযান-৫/LUPEX মিশনে জাপানের রকেটের সঙ্গে ভারতের তৈরি ল্যান্ডার চাঁদের মেরু অঞ্চলে জলের সন্ধান করবে।
* *ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA) ও অন্যান্য:*
২০২৫ সালে ইএসএ-র সঙ্গে মানব মহাকাশ মিশনের যৌথ কর্মসূচী এবং জার্মানি, ইতালি, সৌদি আরব ও মরিশাসের সঙ্গে বিভিন্ন উপগ্রহ ও মহাকাশ গবেষণা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভুটানের সঙ্গে মহাকাশ ক্ষেত্রে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ কাজ করছে।
৪. নাগরিকদের জন্য মহাকাশ - দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তির প্রয়োগ
মহাকাশ প্রযুক্তি এখন ভারতের শাসনব্যবস্থা, উন্নয়ন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে:
* *ন্যাভিক (Navic) - ভারতের নিজস্ব নেভিগেশন সিস্টেম বা দিক নির্ণয়কারী ব্যবস্থা:*
বিদেশী ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমাতে তৈরি এই ব্যবস্থাটি ভারত এবং তার সীমানার বাইরে ১,৫০০ কিমি পর্যন্ত নিখুঁত অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে। ২০২৫ সালে দ্বিতীয় প্রজন্মের এনভিএস-০২ উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। এটি ট্রেন ট্র্যাকিং, বিদ্যুৎ গ্রিড সমন্বয় এবং আধার ডিভাইসের জিও-ট্যাগিং-এর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি ন্যাভিক রেফারেন্স স্টেশন স্থাপনের চুক্তি হয়েছে।
* *উপাত্ত-চালিত শাসন ও খাদ্য নিরাপত্তা:*
কৃষি, জলসম্পদ ও গ্রামীণ উন্নয়নের ক্ষেত্রে উপগ্রহ চিত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। 'ইন্ডিয়া-রাইস' (India-WRIS) প্ল্যাটফর্ম জল ব্যবস্থাপনায় এবং 'potential fishing zone' নির্দেশিকা মৎস্যজীবীদের জ্বালানি ও সময় বাঁচাতে সাহায্য করছে।
* *দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা:*
ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও দাবানল পর্যবেক্ষণের জন্য 'এনডিইএম ৫.০' (NDEM 5.0) রিয়েল-টাইম তথ্য সরবরাহ করছে।
* *স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় উপগ্রহ-ভিত্তিক সমাধান:*
দুর্গম ও উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে (যেমন সিয়াচেন, লাদাখ) ১৭৯টি টেলিমেডিসিন নোড কাজ করছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে 'পিএম ই-বিদ্যা'র অধীনে ৩৭০টি শিক্ষামূলক টেলিভিশন চ্যানেল জিএসএটি-১৫ এবং জিএসএটি-৯ উপগ্রহের মাধ্যমে সম্প্রচারিত হচ্ছে।
*দক্ষিণ এশিয়া স্যাটেলাইট (GSAT-9):*
২০১৭ সালে ভারতের ₹৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই উপগ্রহটি সার্ক (SAARC) অঞ্চলের দেশগুলিকে (পাকিস্তান ব্যতীত) বিনামূল্যে টেলিমেডিসিন, শিক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সুবিধা দেওয়ার জন্য ভারতের একটি উপহার।
উপসংহার
বিগত ১২ বছরে ভারতের মহাকাশ কর্মসূচি প্রমাণ করেছে যে কিভাবে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সরাসরি দেশের সার্বিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। ভারত কেবল বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সীমানাকেই প্রসারিত করেনি, বরং একটি দায়িত্বশীল মহাকাশ শক্তি হিসাবে আন্তর্জাতিক স্তরে মহাকাশের শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ২০৪৭ সালের মহাকাশ ভিশনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের মূল লক্ষ্য মহাকাশ-ভিত্তিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও স্বনির্ভর রাষ্ট্র গড়ে তোলা।
তথ্যসূত্র
Department of Space
Indian Space Research Organisation
Other Government / Official Sources
INDIA'S SPACE ODYSSEY
*******
SSS/PK...
(Explainer ID: 158988)
आगंतुक पटल : 3
Provide suggestions / comments