Social Welfare
ভারতীয় সেনাবাহিনীতে নারীশক্তি - ক্রমবর্ধমান ভূমিকা ও সুযোগ
Posted On:
08 MAR 2026 1:03PM
মূল বিষয়সমূহ
* আন্তর্জাতিক নারী দিবস (৮ মার্চ) উপলক্ষে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে নারীদের ক্রমবর্ধমান নেতৃত্ব ও কার্যকরী ভূমিকা জাতীয় প্রতিরক্ষায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে তুলে ধরে।
* নারী আধিকারিকদের সংখ্যা ২০১৪ সালে প্রায় ৩ হাজার থেকে বেড়ে বর্তমানে ১১ হাজারেরও বেশি হয়েছে, যা সম্প্রসারিত প্রশিক্ষণ সুযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তির ফলে সম্ভব হয়েছে।
* ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমিতে নারীদের প্রবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়েছে; ২০২৫ সালের মে মাসে ১৭ জন এবং নভেম্বর মাসে ১৫ জন নারী ক্যাডেট স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
* নারী আধিকারিকরা এখন লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদসহ বিভিন্ন উচ্চ নেতৃত্ব ও কার্যকরী কমান্ড দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন; এর মধ্যে ফাইটার পাইলট এবং গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের কমান্ডাররাও অন্তর্ভুক্ত।
ভূমিকা
আন্তর্জাতিক নারী দিবস সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা ও নেতৃত্বকে মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ প্রদান করে। এই ক্ষেত্রগুলির মধ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে নারীদের উপস্থিতি একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।
কার্যকরী দায়িত্ব থেকে শুরু করে নেতৃত্বের পদ পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা পেশাদারিত্ব ও নিষ্ঠার সঙ্গে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করছেন। গত কয়েক দশকে তাদের অন্তর্ভুক্তি ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর হিসাবে বিবেচিত হয়েছে।
এক সময় যেখানে নারীদের ভূমিকা প্রধানত চিকিৎসা ও নার্সিং পরিষেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে ধীরে ধীরে নীতি সংস্কার, বিচারসংক্রান্ত সহায়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে।
বর্তমানে সেনা, নৌ ও বায়ুসেনার বিভিন্ন শাখায় নারী আধিকারিকরা ক্রমশ কমান্ড, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছেন, যা ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি, পেশাদারিত্ব এবং কার্যকর সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করছে।
ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নারীদের ঐতিহাসিক অগ্রযাত্রা
ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নারীদের ভূমিকা সীমিত সহায়ক দায়িত্ব থেকে ধীরে ধীরে বিভিন্ন কার্যকরী ও নেতৃত্বের দায়িত্বে সম্প্রসারিত হয়েছে।

প্রথমদিকে সেনাবাহিনীর চিকিৎসা পরিষেবায় নারীদের অন্তর্ভুক্তি শুরু হয়। পরবর্তীতে স্বল্পমেয়াদি কমিশন এবং বিশেষ পদগুলির মাধ্যমে তারা অন্যান্য শাখায় প্রবেশের সুযোগ পান।
ক্রমাগত নীতি সংস্কার এবং বিচারযুক্ত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেনা, নৌ ও বায়ুসেনায় নারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্র প্রসারিত হয়েছে।
স্বাধীনতার পর নারীদের ভূমিকা চিকিৎসা সহায়তা থেকে শুরু করে অফিসার স্তরের নিয়োগ এবং কার্যকরী অবদান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, যা লিঙ্গসমতা ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় ভারতের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
১৯৫৮ সালে প্রথমবারের মতো নারী চিকিৎসকদের সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরে পুরুষদের সমান শর্তে নিয়মিত কমিশন প্রদান করা হয়।
১৯৯২ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে অফিসার স্তরে নারীদের প্রবেশের সুযোগ চালু হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনী ‘উইমেন স্পেশাল এন্ট্রি স্কিম’ চালু করে, যার মাধ্যমে নারীদের অ-যুদ্ধ শাখায় কমিশন দেওয়া হয়।
একই বছরে নৌবাহিনী প্রথমবার নারী অফিসার নিয়োগ করে এবং বায়ুসেনা ফ্লাইং, টেকনিক্যাল ও নন-টেকনিক্যাল শাখায় স্বল্পমেয়াদি কমিশনে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করে।
এই উদ্যোগগুলি ভারতের প্রতিরক্ষা নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করে এবং সেনাবাহিনীতে নারীদের ভূমিকা সম্প্রসারণের ভিত্তি স্থাপন করে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় লিঙ্গ অন্তর্ভুক্তির অগ্রগতি
সেনাবাহিনীতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
নারী অফিসারদের এখন কর্নেল (সিলেক্ট গ্রেড) পদে পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে এবং তাদের কমান্ড দায়িত্বও প্রদান করা হচ্ছে। কর্মজীবনের অগ্রগতিতে কোনো প্রভাব না পড়ার জন্য রূপান্তরকালীন সময়ে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে না পারা অফিসারদের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে।
ভারতীয় সেনাবাহিনী
দীর্ঘমেয়াদের কর্মজীবনের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য নারী অফিসারদের সেনাবাহিনীর ১২টি অস্ত্র ও পরিষেবা শাখায় স্থায়ী কমিশন প্রদান করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি আর্মি মেডিক্যাল কর্পস, আর্মি ডেন্টাল কোর এবং মিলিটারি নার্সিং সার্ভিসেও তারা নিয়োজিত রয়েছেন।
ভারতীয় নৌবাহিনী
নারী অফিসারদের এখন যুদ্ধজাহাজে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে এবং তারা পাইলট ও নেভাল এয়ার অপারেশন অফিসার হিসেবেও কাজ করছেন।
নৌবাহিনীর প্রায় সব শাখা ও বিশেষায়িত ক্ষেত্র নারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে, সাবমেরিন ব্যতীত। এছাড়া, অগ্নিপথ প্রকল্পের অধীনে নারীদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও নৌবাহিনী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।
২০২১ সালে প্রথমবারের মতো একজন নারী অফিসার রিমোটলি পাইলটেড এয়ারক্রাফ্ট স্কোয়াড্রনে যোগ দেন।
২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ভারতীয় নৌবাহিনী একাডেমিতে ১০+২ বি.টেক প্রবেশ প্রকল্পের মাধ্যমেও নারী ক্যাডেটদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ভারতীয় বায়ুসেনা
ভারতীয় বায়ুসেনা ১৯৯০-এর দশকে প্রথম নারীদের পাইলট হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করে।
২০১৫ সালে পরীক্ষামূলক ভিত্তিতে নারীদের যুদ্ধবিমান শাখায় অন্তর্ভুক্তি শুরু হয় এবং ২০২২ সালে এটিকে স্থায়ী নীতি হিসেবে কার্যকর করা হয়।
২০১৭ সাল থেকে ফ্লাইং শাখায় স্বল্পমেয়াদের কমিশনের জন্য এনসিসি বিশেষ প্রবেশ প্রকল্পেও নারীদের জন্য শূন্যপদ রাখা হয়েছে।
ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমির মাধ্যমে নারী ক্যাডেটদের অন্তর্ভুক্তি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে।
২০২৩ সালের ২ ডিসেম্বর থেকে ‘অগ্নিবীর বায়ু (মহিলা)’রাও ভারতীয় বায়ুসেনায় যোগদান করেছেন।
সেনাবাহিনীতে নারীদের উল্লেখযোগ্য সাফল্য
ভারতীয় সেনাবাহিনীতে নারীরা নেতৃত্ব, কার্যকরী দায়িত্ব এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছেন।
২০২৫ সালে সেনা, নৌ ও বায়ুসেনার ১১ জন নারী অফিসার একটি ত্রি-সার্ভিস নৌ অভিযানে অংশ নিয়ে দেশীয় জাহাজ ‘ত্রিবেণী’তে প্রায় ১,৮০০ নটিক্যাল মাইল সমুদ্রযাত্রা সম্পন্ন করেন।
ভারতীয় বায়ুসেনা প্রজাতন্ত্র দিবসের ৭৭তম কুচকাওয়াজে তাদের ব্যান্ডে নয়জন নারী অগ্নিবীরকে অন্তর্ভুক্ত করে। একই অনুষ্ঠানে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট অক্ষিতা ধানকর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।
কয়েকজন উল্লেখযোগ্য নারী আধিকারিক
লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাধনা সাক্সেনা নায়ার - ভারতীয় সেনাবাহিনীর ডিরেক্টর জেনারেল মেডিক্যাল সার্ভিসেস (আর্মি) পদে প্রথম নারী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
কর্নেল পোনুং ডোমিং - বিশ্বের সর্বোচ্চ উচ্চতায় অবস্থিত বর্ডার টাস্ক ফোর্সের কমান্ড গ্রহণকারী প্রথম নারী অফিসার।
স্কোয়াড্রন লিডার ভাবনা কান্ত - ভারতের প্রথম নারী ফাইটার পাইলটদের মধ্যে অন্যতম, যিনি যুদ্ধ অভিযানে অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করেন।
সাব লেফটেন্যান্ট আস্থা পুনিয়া - নৌবাহিনীর ফাইটার পাইলট শাখায় অন্তর্ভুক্ত প্রথম নারী।
স্কোয়াড্রন লিডার অবনী চতুর্বেদী - বিদেশে অনুষ্ঠিত আকাশযুদ্ধ মহড়ায় অংশগ্রহণকারী ভারতীয় বায়ুসেনার প্রথম নারী ফাইটার পাইলট।
স্কোয়াড্রন লিডার শিবাঙ্গী সিং - ভারতের প্রথম নারী রাফাল যুদ্ধবিমান পাইলট।
উইং কমান্ডার অঞ্জলি সিং - বিদেশে নিয়োজিত প্রথম ভারতীয় নারী সামরিক কূটনীতিক।
লেফটেন্যান্ট কমান্ডার দিলনা কে ও রূপা এ - ‘নাভিকা সাগর পরিক্রমা - ২’ অভিযানে অংশ নিয়ে প্রায় ২৫,৬০০ নটিক্যাল মাইল বিশ্বভ্রমণ সম্পন্ন করেন।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
২০২৫ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর স্বাতি শান্তকুমার জাতিসংঘ মহাসচিবের ‘জেন্ডার অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন।
২০২৫ সালের আর্মি ডে পুরস্কারে প্রথমবারের মতো এনসিসি গার্লস কনটিনজেন্টকে সম্মানিত করা হয়।
মেজর রাধিকা সেন রাষ্ট্রসংঘের ‘মিলিটারি জেন্ডার অ্যাডভোকেট অফ দ্য ইয়ার ২০২৩’ সম্মানে ভূষিত হন।
আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে অবদান
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ১৫৪ জনেরও বেশি ভারতীয় নারী বিভিন্ন রাষ্ট্রসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করছেন।
রাষ্ট্রসংঘের জেন্ডার প্যারিটি বা লিঙ্গ সাম্য কৌশল অনুযায়ী ২০২৮ সালের মধ্যে সামরিক ইউনিটে ১৫% এবং স্টাফ অফিসার বা পর্যবেক্ষক পদে ২৫% নারী প্রতিনিধিত্বের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভারত ইতিমধ্যেই স্টাফ অফিসার ও পর্যবেক্ষণ বিভাগে প্রায় ২২% নারী প্রতিনিধিত্ব অর্জন করেছে।
ভবিষ্যৎ পথ
২০১৪ সালে সেনা, নৌ ও বায়ুসেনায় নারী অফিসারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ হাজার। বর্তমানে এই সংখ্যা বেড়ে ১১ হাজারেরও বেশি হয়েছে। চলমান সংস্কার, নারী শক্তি উদ্যোগ এবং লিঙ্গসমতার প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকারের ফলে ভবিষ্যতে সেনাবাহিনীতে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি পাবে। ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমিতে আসন বৃদ্ধি, বিভিন্ন পদে ধীরে ধীরে নারীদের অন্তর্ভুক্তি এবং সমান সুযোগের নীতির মাধ্যমে নারী অফিসাররা আগামী দিনে আরও বড় দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
তথ্যসূত্র
Press Information Bureau
Ministry of Defence
DD News
Ministry of External Affairs
United Nations
Indian Navy
See in PDF
SSS/AS......
(Explainer ID: 157744)
आगंतुक पटल : 6
Provide suggestions / comments