PIB Backgrounder
azadi ka amrit mahotsav

নকশালমুক্ত ভারত

সমন্বিত কৌশলে পরাজিত বামপন্থী উগ্রপন্থা (LWE)

प्रविष्टि तिथि: 01 AUG 2026 11:28AM by PIB Kolkata

১ আগস্ট, ২০২৬

 

ভারত কার্যত বামপন্থী উগ্রবাদ (এলডব্লিউই) থেকে মুক্ত হওয়ার এক ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জন করেছে। বর্তমানে দেশের কোনো জেলাই আর এলডব্লিউই-প্রভাবিত নয়। নিরাপত্তা অভিযান, পরিকাঠামো সম্প্রসারণ, আত্মসমর্পণকারী ক্যাডারদের পুনর্বাসন, আদিবাসী কল্যাণ এবং সুশাসনকে সমন্বিত করে গৃহীত এক সুসংহত কৌশলের ফলেই এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। এই সমন্বিত উদ্যোগ সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রশাসনের উপস্থিতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছে, যার ফলে শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য এক স্থায়ী ভিত্তি গড়ে উঠেছে। 

শান্তি ও নিরাপত্তার নতুন যুগ
প্রায় ছয় দশক ধরে ভারত বামপন্থী উগ্রবাদ (Left-Wing Extremism বা LWE)-এর চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করেছে। এটি কোনো দূরবর্তী বা বিমূর্ত সমস্যা ছিল না; বরং লক্ষ লক্ষ আদিবাসী পরিবার, সড়ক ও বিদ্যালয়ের মতো মৌলিক পরিষেবা থেকে বিচ্ছিন্ন গ্রাম এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মূলধারা থেকে বঞ্চিত মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা ছিল। দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতা অব্যাহত ছিল এবং অনিশ্চয়তাই ছিল সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবনের বৈশিষ্ট্য।

২০২৬ সালের ৩১ মার্চ এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে এবং ভারত কার্যত নকশালবাদমুক্ত হয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করে। ২০১৪ সালের মে মাসে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় ‘রেড করিডর’ ছিল দেশের অন্যতম গুরুতর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। এর আগে গৃহীত পদক্ষেপগুলি ছিল মূলত বিচ্ছিন্ন এবং ঘটনাভিত্তিক, যা সমস্যার মূল কারণ দূর করার পরিবর্তে কেবল তার লক্ষণগুলিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীকালে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আরও সমন্বিত ও সর্বাঙ্গীণ কৌশল গ্রহণ করা হয়।

গত বারো বছরের রূপান্তর
গত বারো বছরে এই পরিবর্তন তিনটি পরস্পর-পরিপূরক কর্মধারার মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য নিরাপত্তা অভিযান জোরদার করা, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, আত্মসমর্পণ ও পুনর্বাসনের জন্য সুসংগঠিত কাঠামো গড়ে তোলা এবং ধারাবাহিকভাবে সম্প্রদায়ভিত্তিক জনসংযোগ কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়। পরিকাঠামো সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ভৌত ও ডিজিটাল সংযোগ উন্নত করা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রশাসনিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং সুস্থায়ী অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কল্যাণমূলক উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল মর্যাদাপূর্ণ জীবন, অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিষেবা প্রদান, সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে জাতীয় উন্নয়নের মূল স্রোতে যুক্ত করা।

গত ১২ বছরে এই পরিবর্তন তিনটি পরস্পর-পরিপূরক কর্মধারার মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য নিরাপত্তা অভিযান জোরদার করা, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, আত্মসমর্পণ ও পুনর্বাসনের জন্য সুসংগঠিত কাঠামো গড়ে তোলা এবং ধারাবাহিকভাবে সম্প্রদায়ভিত্তিক জনসংযোগ কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়। পরিকাঠামো সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ভৌত ও ডিজিটাল সংযোগ উন্নত করা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রশাসনিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং সুস্থায়ী অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কল্যাণমূলক উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল মর্যাদাপূর্ণ জীবন, অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিষেবা প্রদান, সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে জাতীয় উন্নয়নের মূল স্রোতে যুক্ত করা।

এই প্রতিটি কর্মধারা একে অপরকে আরও শক্তিশালী করেছে। নিরাপত্তা উন্নয়নের পথ সুগম করেছে। উন্নয়ন মানুষের আস্থা আরও গভীর করেছে। আর সেই আস্থা কল্যাণমূলক পরিষেবার দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করেছে। এটি কোনো ধারাবাহিক প্রক্রিয়া ছিল না; বরং অগ্রগতির এক অবিচ্ছেদ্য শৃঙ্খল ছিল।
রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা 

এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে রাষ্ট্রের ধারাবাহিক উপস্থিতি নিশ্চিত করে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস পুনর্গঠন করা। কার্যকর প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা সংস্থা এবং প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা হয়। এই পদ্ধতির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান জনগোষ্ঠী ও রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

২০১৪ সালের আগে সহিংসতার চরম পর্যায় 
বামপন্থী উগ্রবাদের (LWE) সূত্রপাত হয় ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি আন্দোলনের মাধ্যমে, যা মাওবাদী মতাদর্শ এবং সশস্ত্র বিপ্লবের নীতিতে অনুপ্রাণিত ছিল। এর মূল বিশ্বাস ছিল সহজ কিন্তু সহিংস—‘ক্ষমতা বন্দুকের নল থেকেই আসে’। নকশালদের ব্যবহৃত অস্ত্রের প্রায় ৯২ শতাংশই সরাসরি পুলিশ অস্ত্রাগার থেকে লুঠ করা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একাধিক উগ্রপন্থী সংগঠন ২০০৪ সালে সিপিআই (মাওবাদী)-এর অধীনে একীভূত হয়, যার ফলে এটি ভারতের অন্যতম বৃহৎ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়।

২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়কাল বামপন্থী উগ্রবাদের (এলডব্লিউই) ইতিহাসে অন্যতম সহিংস দশক ছিল। ২০১০ সালে সহিংসতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়; ওই এক বছরেই ১,৯৩৬টি সহিংস ঘটনার পাশাপাশি ৭২০ জন সাধারণ নাগরিক নিহত হন। পুরো দশকে মোট ১৭,৫৪২টি সহিংস ঘটনা, ১,৯১৩ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যের মৃত্যু এবং ৫,০১৯ জন সাধারণ নাগরিকের প্রাণহানি ঘটে।
তখন কোনো সুসংহত জাতীয় নীতি ছিল না। রাজ্য সরকারগুলি বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করত। তবুও ২০০৯ সালে তৎকালীন সরকার প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিল যে, নকশালবাদই ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ, যারণ ভৌগোলিক বিস্তার কাশ্মীর এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
নীতিগত পরিবর্তন: বিচ্ছিন্ন প্রতিক্রিয়া থেকে সমন্বিত কৌশল 
২০১৫ সালে বামপন্থী উগ্রবাদ মোকাবিলায় জাতীয় নীতি ও কর্মপরিকল্পনা (National Policy and Action Plan) অনুমোদনের মাধ্যমে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর ফলে আগের তাৎক্ষণিক ও বিচ্ছিন্ন পদ্ধতির পরিবর্তে সমগ্র সরকারভিত্তিক একটি সুসংগঠিত কাঠামো গড়ে ওঠে। এই পরিকল্পনার আওতায় কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (CAPF) মোতায়েন, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং Security Related Expenditure (SRE), Special Infrastructure Scheme (SIS) ও Special Central Assistance (SCA) প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থ বরাদ্দ করা হয়। পাশাপাশি নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি, সমস্যার সামাজিক ওঞ অর্থনৈতিক মূল কারণগুলিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করা হয়। ২০১৭ সালে SCA প্রকল্প চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ₹৪,২৮৯.২০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
Special Infrastructure Scheme (SIS)-এর আওতায় এলডব্লিউই-প্রভাবিত রাজ্যগুলিতে বিশেষ বাহিনী, বিশেষ গোয়েন্দা শাখা, জেলা পুলিশকে শক্তিশালী করা এবং সুরক্ষিত পুলিশ স্টেশন নির্মাণের জন্য ₹১,৭৬১ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে।

২০১৪-১৫ অর্থবর্ষ থেকে Security Related Expenditure (SRE) প্রকল্পের আওতায় ₹৩,৮০৫.০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এই অর্থ নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান পরিচালনার প্রয়োজন, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণ, আত্মসমর্পণকারী বামপন্থী উগ্রবাদী ক্যাডারদের পুনর্বাসন এবং শহিদ নিরাপত্তা কর্মী ও নিহত সাধারণ নাগরিকদের পরিবারের জন্য এককালীন আর্থিক সহায়তা প্রদানে ব্যবহৃত হয়েছে। 
প্রথমবারের মতো ভারত বামপন্থী উগ্রবাদ মোকাবিলায় সংলাপ, নিরাপত্তা এবং সমন্বয়—এই তিনটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে একটি সুসংগঠিত ও সর্বাঙ্গীণ কৌশল বাস্তবায়ন করে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে আরও সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে এই উদ্যোগ পরিচালিত হয়, যার ফলে নীতি বাস্তবায়নে অধিকতর সঙ্গতি ও কার্যকারিতা নিশ্চিত হয়।
সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে নকশালবাদের ভয় ও সহিংসতা থেকে ভারতকে মুক্ত করার লক্ষ্য সফলভাবে অর্জিত হয়েছে। ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট ভারত সরকার ২০২৬ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে দেশকে নকশালমুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করে। নিরাপত্তা অভিযান জোরদার, আরও কার্যকর সমন্বয়, পরিকাঠামোর সম্প্রসারণ এবং দ্রুত উন্নয়নমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই এই লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হয়েছে।
নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা 
পরিকাঠামোর সম্প্রসারণ, বিশেষায়িত বাহিনী মোতায়েন এবং অভিযান পরিচালনায় আরও উন্নত সমন্বয়ের মাধ্যমে সরকার পরিকল্পিতভাবে নকশাল-প্রভাবিত এলাকায় বিদ্যমান নিরাপত্তা শূন্যতা দূর করেছে। এই সমন্বিত উদ্যোগের ফলে রেড করিডর জুড়ে রাষ্ট্রের উপস্থিতি, বাহিনীর গতিশীলতা, গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান এবং সন্ত্রাস দমন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। 

২০১৪ সালের আগে যেখানে মাত্র ৬৬টি সুরক্ষিত পুলিশ স্টেশন নির্মিত হয়েছিল, সেখানে পরবর্তীকালে ৬৬৩টি সুরক্ষিত পুলিশ স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া, গত সাত বছরে নিরাপত্তা বলয় আরও মজবুত করতে, এলাকায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে এবং দুর্গম অরণ্যাঞ্চলে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনার লক্ষ্যে CAPF-এর ৪০৮টি নতুন নিরাপত্তা শিবির স্থাপন করা হয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুত বাহিনী মোতায়েন, সেনা চলাচল, আহতদের সরিয়ে নেওয়া এবং নজরদারির সুবিধার্থে ৬৮টি নাইট-ল্যান্ডিং হেলিপ্যাড নির্মাণ করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীকে ৪০০টি বুলেটপ্রুফ ও বিস্ফোরণ-প্রতিরোধী যানবাহন প্রদান করা হয়েছে এবং তাদের কল্যাণ ও চিকিৎসা পরিষেবার জন্য পাঁচটি হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে।

এলিট বাহিনীর সমন্বয়:

 CoBRA, DRG, STF এবং Greyhounds 
একটি বহুস্তরবিশিষ্ট ও বিশেষায়িত নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা হয়, যেখানে CoBRA (Commando Battalion for Resolute Action), CRPF, District Reserve Guard (DRG) এবং ঝাড়খণ্ড জাগুয়ার, ছত্তিশগড় পুলিশের বিশেষ ইউনিট ও অন্ধ্রপ্রদেশের Greyhounds-এর মতো রাজ্যস্তরের এলিট বাহিনীকে একত্রিত করা হয়। DRG, STF, CRPF এবং CoBRA-র যৌথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সুস্পষ্ট কমান্ড কাঠামোসহ একটি সমন্বিত ও পারস্পরিকভাবে সক্ষম নিরাপত্তা বাহিনী গড়ে ওঠে। 

প্রযুক্তি: পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি 

২০১৪ সালের পর আধুনিক প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে কেন্দ্র সরকার নকশালবিরোধী অভিযানকে আমূল পরিবর্তন করে। মনুষ্যবিহীন আকাশযান (UAV), ড্রোন, স্যাটেলাইট চিত্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও নির্ভুল নজরদারি সম্ভব হয়। উন্নত অবস্থান-নির্ধারণ ব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কল-লগ বিশ্লেষণ, মোবাইল ডেটা বিশ্লেষণ এবং সামাজিক মাধ্যম পর্যবেক্ষণ কার্যকরভাবে চালু করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য ব্যবহার করে গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, যোগাযোগের ধরণ বিশ্লেষণ এবং অভিযান পরিচালনার দক্ষতা আরও বাড়িয়ে তোলে। 

‘ট্রেস, টার্গেট, নিউট্রালাইজ’: উল্লেখযোগ্য অভিযান 
সরকারের ‘ট্রেস, টার্গেট, নিউট্রালাইজ’ নীতি উল্লেখযোগ্য সাফল্য এনে দেয়। ধারাবাহিক নিরাপত্তা অভিযান এবং গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক কৌশলের মাধ্যমে সরকার তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বামপন্থী উগ্রবাদীদের প্রভাবাধীন এলাকাগুলিকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। 
অপারেশন ব্ল্যাক ফরেস্ট, অপারেশন অক্টোপাস, অপারেশন ডাবল বুল, অপারেশন থান্ডারস্টর্ম, অপারেশন ভীমবার্গ এবং অপারেশন চক্রবন্ধার মতো একাধিক সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে নকশাল-প্রভাবিত অঞ্চলে মাওবাদী নেটওয়ার্ক উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এর মধ্যে অপারেশন ব্ল্যাক ফরেস্ট ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য, যার মাধ্যমে মাওবাদীদের একটি প্রধান ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়, ৩০ জনেরও বেশি মাওবাদী নিহত হয় এবং গ্রেপ্তার ও আত্মসমর্পণের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। অপারেশন ডাবল বুলের ফলে ঝাড়খণ্ডের গুমলা, লোহারদাগা এবং লাতেহার জেলা নকশালমুক্ত হয়।

 সম্মিলিতভাবে এই অভিযানের ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবিত এলাকাগুলিতে রাষ্ট্রের উপস্থিতি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়, উগ্রপন্থীদের প্রভাব হ্রাস পায় এবং নিরাপত্তা, সুশাসন ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
সহায়ক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া 
কেন্দ্র সরকার একটি সর্বাঙ্গীণ ‘অল-এজেন্সি’ (All-Agency) পদ্ধতি গ্রহণ করে, যার লক্ষ্য ছিল শুধু সশস্ত্র ক্যাডারদের নয়, বরং তাদের সমর্থন জোগানো সমগ্র নেটওয়ার্ককে নিষ্ক্রিয় করা। উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটি ছিল ‘হোল-অফ-গভর্নমেন্ট’ (Whole-of-Government) পদ্ধতি, আর নিরাপত্তা অভিযানের ক্ষেত্রে ছিল ‘হোল-অফ-এজেন্সি’ (Whole-of-Agency) কৌশল। 
নকশালদের অর্থায়ন ব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে জাতীয় তদন্ত সংস্থার (NIA) অধীনে একটি বিশেষ শাখা গঠন করা হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এনআইএ ₹৪০ কোটিরও বেশি মূল্যের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেছে।

 এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) ₹১২ কোটি মূল্যের সম্পত্তি সংযুক্ত (attach) করেছে, আর রাজ্য সংস্থাগুলি অতিরিক্ত ₹৪০ কোটি মূল্যের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বামপন্থী উগ্রবাদ (LWE) সংক্রান্ত ১১১টি মামলার তদন্ত সম্পন্ন হয় এবং ৯৮টি চার্জশিট দাখিল করা হয়। ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত এনআইএ-র মোট মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১২টি, যার মধ্যে ১০০টি মামলায় চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। 
আত্মসমর্পণকারীদের জন্য ‘রেড কার্পেট’
সরকারের দৃঢ় নিরাপত্তা পদক্ষেপের পাশাপাশি পুনর্বাসনভিত্তিক একটি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিও গ্রহণ করা হয়েছে, যার মূল বার্তা ছিল— “যারা অস্ত্র ছেড়ে আত্মসমর্পণ করবে, তাদের জন্য রয়েছে ‘রেড কার্পেট’।”

 আত্মসমর্পণকারী উচ্চপদস্থ ক্যাডারদের অবিলম্বে ₹৫ লক্ষ এবং অন্যান্য ক্যাডারদের ₹২.৫ লক্ষ টাকার আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়। এছাড়া ৩৬ মাস ধরে প্রতি মাসে ₹১০,০০০ ভাতা দেওয়া হয়। আত্মসমর্পণের জন্য অতিরিক্ত ₹৫০,০০০ প্রণোদনা দেওয়া হয়, যা দলগত আত্মসমর্পণের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ করা হয়। পাশাপাশি অস্ত্র জমা দিলে অতিরিক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণও প্রদান করা হয়। 
পুনর্বাসন নীতির ফলে আত্মসমর্পণের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধুমাত্র ২০২৫ সালেই ২,৩৩৭ জন নকশাল অস্ত্র ত্যাগ করে আত্মসমর্পণ করেন। ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত মোট ৩,৯২৭ জন ক্যাডার আত্মসমর্পণ করেছেন। এই উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা, সাংবাদিক, সমাজনেতা এবং জনপ্রতিনিধিরা। তাঁরা পুনর্বাসন ব্যবস্থার প্রতি আস্থা গড়ে তুলতে এবং প্রভাবিত ব্যক্তিদের মূলধারার জীবনে ফিরে আসতে উৎসাহিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিরাপত্তা অভিযান ও পুনর্বাসন- এই সমন্বিত কৌশলের কার্যকারিতাকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। ২০২৬ সালের ২৮ জুলাই ‘নয়ী দিশা, নয়ি পহেল’ নকশালবিরোধী অভিযানের আওতায় কোলহান ও লাতেহার অঞ্চল থেকে ১৬ জন সক্রিয় মাওবাদী রাঁচিতে আত্মসমর্পণ করেন। আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে ছিলেন একজন রিজিওনাল কমান্ডার, তিনজন জোনাল কমান্ডার, তিনজন সাব-জোনাল কমান্ডার, ছয়জন এরিয়া কমান্ডার এবং তিনজন ক্যাডার-স্তরের সদস্য। তাঁরা আত্মসমর্পণের সময় ১১টি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, ৩৮টি ম্যাগাজিন এবং ১,৫৬২ রাউন্ড গুলি জমা দেন। 

এছাড়াও, ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই ₹৪৯ লক্ষ টাকার সম্মিলিত পুরস্কার ঘোষিত আরও আটজন মাওবাদী বিজাপুর পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন, যা বামপন্থী উগ্রবাদবিরোধী অভিযানে আরেকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসাবে চিহ্নিত হয়। একই দিনে নিরাপত্তা বাহিনী ধানবাদ-গিরিডিহ সীমান্ত থেকে ₹১ কোটি টাকার পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ মাওবাদী নেতা ও পলিটব্যুরো সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত যৌথ অভিযানে ₹১৫ লক্ষ টাকার পুরস্কার ঘোষিত এক রিজিওনাল কমিটি সদস্য, একজন মাওবাদী ক্যাডার এবং দুই গ্রামবাসীকেও আটক করা হয়। 

এই নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সাফল্য শুধু আইন-শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এগুলি সুস্থায়ী উন্নয়নের ভিত্তিও গড়ে তোলে। প্রতিটি সুরক্ষিত পুলিশ স্টেশন, প্রতিটি CAPF শিবির এবং প্রতিটি আত্মসমর্পণকারী ক্যাডারের মাধ্যমে প্রশাসনের পরিধি এমন সব অঞ্চলে বিস্তৃত হয়েছে, যেখানে আগে পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার ফলে আদিবাসী এলাকায় সড়ক, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ব্যাঙ্কিং পরিষেবা এবং ডিজিটাল সংযোগ পৌঁছে দেওয়ার পথ প্রশস্ত হয়। স্থিতিশীলতা ও আস্থার এই পুনঃপ্রতিষ্ঠাই পরবর্তী পরিকাঠামোগত রূপান্তরের দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করে। 

নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণ:
 পরিকাঠামো ও সংযোগ ব্যবস্থা
নকশালবাদের অবসান ঘটানোর সংকল্প কখনও শুধুমাত্র নকশালদের নির্মূল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, বড় শহরগুলিতে যে সব সুযোগ-সুবিধা উপলব্ধ, সেগুলি যেন এই অঞ্চলের দরিদ্র আদিবাসীদের কাছেও পৌঁছায়, যাতে তাঁদের সন্তানরাও একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে। এই পর্যায়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিকাঠামো, সংযোগ ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক পরিষেবার সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। এর ফলে, অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা, সড়ক এবং ডিজিটাল নেটওয়ার্কে মানুষের প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি পায়। এই উদ্যোগগুলি দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত এলাকাগুলিকে মূলধারার উন্নয়ন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

সড়ক সংযোগ:

 এলডব্লিউই-প্রভাবিত এলাকায় সড়ক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করতে Road Requirement Plan (RRP) এবং Road Connectivity Project for LWE Affected Areas (RCPLWEA) — এই দুটি বিশেষ প্রকল্পের আওতায় মোট ১৫,১৮৯ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে।
ডিজিটাল ও মোবাইল সংযোগ: আধুনিক সমাজে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

 গ্রামীণ আদিবাসী সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। এটি ডিজিটাল বৈষম্য কমায়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবায় প্রবেশাধিকার বাড়ায় এবং অর্থনৈতিক সুযোগের দ্বার উন্মুক্ত করে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ৯,৪৯৭টি মোবাইল টাওয়ার চালু করা হয়েছে। একসময় সবচেয়ে বেশি এলডব্লিউই-প্রভাবিত এলাকাগুলিতে এখন ৯৬ শতাংশ গ্রাম (৪৬,৫৯২টির মধ্যে ৪৪,৭২৮টি গ্রাম) মোবাইল সংযোগের আওতায় এসেছে, যার ফলে শিক্ষা, অনলাইন পরিষেবা এবং অর্থনৈতিক বিকাশের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। 
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি: গত ১২ বছরে কেন্দ্র সরকার এলডব্লিউই-প্রভাবিত জেলাগুলিতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ করেছে। ২০১৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ১,৮০৪টি ব্যাঙ্ক শাখা চালু হয়েছে, ১,৩২১টি এটিএম স্থাপন করা হয়েছে, ৭৪,৭২০ জন ব্যাঙ্কিং করেসপন্ডেন্ট নিয়োগ করা হয়েছে এবং ৬,০২৫টি ডাকঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। 

শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন: গত বারো বছরে ভারত সরকার ২৫৯টি একলব্য মডেল আবাসিক বিদ্যালয় (EMRS) অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে ১৭৯টি বিদ্যালয় ইতিমধ্যেই চালু হয়েছে। এছাড়া, এই এলাকাগুলিতে ৪৭টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (ITI) এবং ৪৯টি স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (SDC) গড়ে তোলা হয়েছে। এই সব উদ্যোগে মোট প্রায় ₹৮০০ কোটি বিনিয়োগ করা হয়েছে। এর ফলে, আদিবাসী যুবকদের জন্য শিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে পেরেছেন। ৯০,০০০-এরও বেশি যুবক-যুবতী ও মহিলাকে দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। 

ট্রাইবাল ইয়ুথ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম (TYEP)-এর আওতায় একসময়ের এলডব্লিউই-প্রভাবিত এলাকার আদিবাসী যুবকদের দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষা সফরে নিয়ে যাওয়া হয়, যাতে জাতীয় সংহতি, সাংস্কৃতিক সচেতনতা এবং উন্নয়নমূলক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়। ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩৭,৬৫৫ জন আদিবাসী যুবক-যুবতী এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছেন। 
সিভিক অ্যাকশন প্রোগ্রাম: এই কর্মসূচির আওতায় ভারত সরকার CAPF-কে তাদের কার্যক্ষেত্রে জন-কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। এর মধ্যে রয়েছে চিকিৎসা শিবিরের আয়োজন, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা পরিচালনা এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ। 
২০১৪ সাল থেকে এই কর্মসূচির আওতায় ₹২২১.৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা নিরাপত্তা বাহিনী ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি এবং দূরত্ব কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। 
গ্রামগুলিকে সংযুক্তকারী সড়ক, যোগাযোগ সহজ করা মোবাইল টাওয়ার, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ব্যাঙ্ক এবং আদিবাসী যুবকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেওয়া বিদ্যালয়—এই সব পরিকাঠামোগত উন্নয়ন সরাসরি মানুষের কল্যাণে প্রতিফলিত হয়েছে। এগুলিই এমন একটি ভৌত ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করেছে, যার ওপর প্রকৃত জনকল্যাণ, মর্যাদাপূর্ণ জীবন এবং সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের পথ সুগম হয়েছে। 

সামগ্রিকভাবে, প্রভাবিত অঞ্চলে পরিকাঠামোর উন্নয়ন সুস্থায়ী পরিকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে আঞ্চলিক সংহতিকে আরও শক্তিশালী করেছে। উন্নত সংযোগ ব্যবস্থা অর্থনৈতিক সুযোগ ও মানুষের চলাচলকে ত্বরান্বিত করেছে। দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ সুস্থায়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ভিত্তি নিশ্চিত করেছে। 
আপনি কি জানেন? বর্তমানে ভারতে ৩৭টি জেলাকে ‘লিগ্যাসি’ এবং ‘থ্রাস্ট’ জেলা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে নিরাপত্তা ও উন্নয়নমূলক সহায়তা অব্যাহত রাখা হয়েছে। এছাড়া একটি জেলাকে ‘ডিস্ট্রিক্ট অফ কনসার্ন’ হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে, যাতে ধারাবাহিক নজরদারি বজায় রাখা এবং অর্জিত সাফল্য সুসংহত করা যায়। 

জনকল্যাণ ও মর্যাদা 

কৌশলের এই শেষ স্তম্ভটি মর্যাদা ও অন্তর্ভুক্তির সঙ্গে জনকল্যাণমূলক পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। এর মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে, অত্যাবশ্যকীয় জনপরিষেবায় সকলের সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

আদিবাসী জীবিকার ক্ষমতায়ন 

আদিবাসী কল্যাণের ওপর ধারাবাহিক গুরুত্ব আরোপ এলডব্লিউই-এর প্রভাব কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। উন্নয়নের প্রসার, সুযোগ-সুবিধায় প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার মাধ্যমে এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি, সরকার উন্নত শিক্ষা, পরিকাঠামো, স্বাস্থ্য পরিষেবা, আবাসন এবং জীবিকা সহায়তার মাধ্যমে প্রত্যন্ত আদিবাসী অঞ্চলে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দিয়েছে। 
আত্মসমর্পণকারী ক্যাডারদের পুনর্বাসন কাঠামোর মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন, জীবিকা সহায়তা, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার আওতায় আবাসন সুবিধা এবং স্বনিযুক্তির জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করে তাঁদের মূলধারার সমাজে অন্তর্ভুক্ত হতে উৎসাহিত করা হয়েছে। যেসব গ্রাম নকশাল প্রভাবমুক্ত হয়ে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত পঞ্চায়েত গঠন করেছে, তাদের উন্নয়নের জন্য বিশেষ অনুদান প্রদান করা হয়েছে। আত্মসমর্পণকারী ক্যাডারদের সন্তানদের দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা তাঁদের পরিবারকে আরও নিরাপদ ও স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে। 

এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে একাধিক লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ। জাতীয় নীতি ও কর্মপরিকল্পনা নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং সম্প্রদায়ের অধিকার সুরক্ষাকে একত্রিত করেছে। স্পেশাল সেন্ট্রাল অ্যাসিস্ট্যান্স (Special Central Assistance) কর্মসূচির মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত জেলাগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ জন-পরিকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। অ্যাসপিরেশনাল ডিস্ট্রিক্টস প্রোগ্রাম (Aspirational Districts Programme) স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং সংযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য একাধিক কল্যাণমূলক প্রকল্পকে সমন্বিত করেছে।
এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে শিক্ষা। একলব্য মডেল রেসিডেন্সিয়াল স্কুল (EMRS)-এর জন্য বাড়তি সহায়তার ফলে, তফসিলি জনজাতি সম্প্রদায়ের শিশুদের, বিশেষত এলডব্লিউই-প্রভাবিত অঞ্চলের শিশুদের, মানসম্মত আবাসিক শিক্ষার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পিএম-জনমন (PM-JANMAN) উদ্যোগের মাধ্যমে বিশেষভাবে দুর্বল জনজাতি গোষ্ঠী (PVTGs)-এর জন্য আবাসন, নিরাপদ পানীয় জল, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং প্রয়োজনীয় সংযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে জোর দেওয়া হয়েছে, যার ফলে এতদিন উন্নয়নের মূলধারা থেকে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের স্রোতে যুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
ধরতি আবা জনজাতীয় গ্রাম উৎকর্ষ অভিযান (Dharti Aaba Janjatiya Gram Utkarsh Abhiyan) চালু হওয়ার ফলে, আদিবাসী গ্রামগুলিতে পরিকাঠামোগত ঘাটতি দূর করার প্রচেষ্টা আরও জোরদার হয়েছে।
একাধিক মন্ত্রকের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই কর্মসূচিগুলির লক্ষ্য হল, জীবনযাত্রার মান উন্নত করা, অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারণ করা এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের ভারতের উন্নয়নের যাত্রায় পূর্ণাঙ্গ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। 
কেস স্টাডি: নকশালবাদ থেকে উন্নয়নের পথে ছত্তীসগঢ়ের যাত্রা 
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ছত্তীসগঢ়ের বস্তার অঞ্চলটি দেশের অন্যতম নকশাল-প্রভাবিত এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। সীমিত যোগাযোগ ব্যবস্থা, দুর্বল প্রশাসনিক উপস্থিতি এবং দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থার সুযোগ নিয়ে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলি সেখানে শক্ত ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল। গত ১২ বছরে নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকে একত্রিত করে গৃহীত সমন্বিত কৌশল এই অঞ্চলের গতিপথ আমূল পরিবর্তন করেছে। 
২০১৭ সালে বাস্তারিয়া ব্যাটালিয়ন (Bastariya Battalion) গঠনের মাধ্যমে এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে। এই ব্যাটালিয়নে ১,১৪৩ জন সদস্য নিয়োগ করা হয়, যার মধ্যে বিজাপুর, সুকমা এবং দান্তেওয়াড়ার প্রায় ৪০০ জন স্থানীয় যুবক ছিলেন। স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করেছে, নিরাপত্তা বাহিনী ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি করেছে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। 

নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়নের গতিও বৃদ্ধি পায়। বস্তার, বিজাপুর, দান্তেওয়াড়া, সুকমা, নারায়ণপুর, কাঁকের এবং কোন্ডাগাঁও জেলাজুড়ে বিস্তৃত বস্তার অঞ্চলে ৩,২৪০ কিলোমিটারেরও বেশি রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, ডিজিটাল সংযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য ৮৮৯টি মোবাইল টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে। একসময় বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা গ্রামগুলি বাজার, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্য পরিষেবা, ব্যাঙ্কিং পরিষেবা এবং বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

সরকার পুনর্বাসন ও মূলধারায় পুনরায় অন্তর্ভুক্তির ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। প্রায় ৩,০০০ জন আত্মসমর্পণকারী ক্যাডারের জন্য একটি বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যার জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, শিক্ষা এবং জীবিকার সুযোগ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে প্রাথমিকভাবে ₹২০ কোটি বরাদ্দ করা হয়েছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল সহিংসতার চক্রের পরিবর্তে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের নতুন পথ তৈরি করা। 

২০২৬ সালের মে মাসে নিরাপত্তা ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যকে স্থায়ী উন্নয়নে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে ‘শহিদ বীর গুন্ডা ধুর সেবা ডেরা’ (Shaheed Veer Gunda Dhur Seva Dera) উদ্যোগ চালু করা হয়। প্রায় ৭০টি সিএপিএফ (CAPF) ক্যাম্পকে পরিষেবা কেন্দ্রে রূপান্তরিত করা হচ্ছে, যেখানে সরকারি প্রকল্প, স্বাস্থ্য পরিষেবা, ব্যাঙ্কিং, কৃষি সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অন্যান্য নাগরিক পরিষেবা প্রদান করা হচ্ছে। বীর গুন্ডাধুরের জন্মস্থান নেতানারে একটি কমন সার্ভিস সেন্টার (Common Service Centre) প্রতিষ্ঠা উগ্রপন্থা-প্রভাবিত অঞ্চলে প্রশাসনের প্রত্যাবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। 

পরিকাঠামো উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের পাশাপাশি ‘বস্তার পাণ্ডুম’ (Bastar Pandum) এবং ‘বস্তার অলিম্পিক্স’ (Bastar Olympics)-এর মতো সাংস্কৃতিক উদ্যোগ সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ এবং আদিবাসী পরিচয়কে আরও শক্তিশালী করেছে। এই উদ্যোগগুলির মাধ্যমে লক্ষাধিক আদিবাসী যুবক-যুবতী ও শিল্পী একত্রিত হয়েছেন, যা সামাজিক সংহতি বৃদ্ধি করার পাশাপাশি, অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। 
বস্তারের এই রূপান্তর প্রমাণ করে যে, নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে উন্নয়ন, জনকল্যাণমূলক পরিষেবা এবং সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়ন যুক্ত হলে তবেই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। ছত্তীসগঢ়ের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সরকারের ধারাবাহিক উপস্থিতি, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি কীভাবে সংঘাত-প্রভাবিত একটি অঞ্চলকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
এক দশকের রূপান্তরের ফলাফল
বামপন্থী উগ্রপন্থা (LWE)-প্রভাবিত জেলার সংখ্যা ২০১৪ সালের ১২৬ থেকে কমে ২০২৬ সালের মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে শূন্যে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে, সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত জেলার সংখ্যাও ৩৫ থেকে শূন্যে নেমে এসেছে, যা দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেছে। 

হিংসার প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সূচকেই এই পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ২০১০ সাল ছিল নকশালবাদের ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী সময়, যখন নকশাল-সংক্রান্ত ১,৯৩৬টি ঘটনা এবং ১,০০৫টি মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়। এরপর থেকে ধারাবাহিক নিরাপত্তা অভিযান, উন্নয়নমূলক হস্তক্ষেপ এবং উন্নত প্রশাসনিক ব্যবস্থার ফলে বামপন্থী উগ্রপন্থা (LWE)-র নেটওয়ার্ক উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। নকশাল-সংক্রান্ত ঘটনার সংখ্যা ২০১৪ সালের ৮৭০ থেকে কমে ২০২৬ সালে (২৯ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত) মাত্র ৩৩-এ নেমে এসেছে। একই সময়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৩১০ থেকে কমে ১১-তে দাঁড়িয়েছে। 
সহিংসতার ধারাবাহিক হ্রাস নকশাল গোষ্ঠীগুলির কার্যক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ার পাশাপাশি প্রভাবিত অঞ্চলে নিরাপত্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের আস্থার ধীরে ধীরে পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দেয়। 
এই প্রবণতা দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির প্রতিফলন। যে অঞ্চলগুলি একসময় ঘন ঘন সহিংসতায় জর্জরিত ছিল, সেখানে এখন শান্তি ও জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে লক্ষণীয় অগ্রগতি দেখা গেছে।
ভারতের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায় 
নকশালমুক্ত ভারত গড়ে তোলার সাফল্য স্বাধীন ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সাফল্য দৃঢ় নেতৃত্ব, ধারাবাহিক নীতি বাস্তবায়ন এবং নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও পুনর্বাসনকে সমন্বিত করে গৃহীত বহুমাত্রিক কৌশলের কার্যকারিতার প্রতিফলন। 
গত এক দশকে ভারত বামপন্থী উগ্রপন্থা মোকাবিলার কৌশলে আমূল পরিবর্তন এনেছে—প্রতিক্রিয়াশীল নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সক্রিয়ভাবে নির্মূল করার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। পরবর্তী যাত্রা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। নকশালমুক্ত ভারত কেবল একটি সশস্ত্র আন্দোলনের অবসান নয়; এটি ভারতের সবচেয়ে প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য শান্তি, অন্তর্ভুক্তি এবং অগ্রগতির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।


তথ্যবিবরণী

Click here to see pdf

 

SSS/RP........


(रिलीज़ आईडी: 2293171) आगंतुक पटल : 8
इस विज्ञप्ति को इन भाषाओं में पढ़ें: English , Urdu , हिन्दी , Gujarati