প্রধানমন্ত্রীরদপ্তর
নেদারল্যান্ডসে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে ভারত-নেদারল্যান্ডস যৌথ বিবৃতি
প্রকাশিত:
17 MAY 2026 3:45AM by PIB Kolkata
নতুন দিল্লি, ১৭ মে ২০২৬
নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী মাননীয় রব জেটেন-এর আমন্ত্রণে, প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী ১৬-১৭ মে ২০২৬ তারিখে নেদারল্যান্ডসে এক সরকারি সফর করেন। এটি ছিল নেদারল্যান্ডসে প্রধানমন্ত্রী মোদীর দ্বিতীয় সফর।
১৬ মে সকালে, নেদারল্যান্ডসের মহামান্য রাজা উইলেম আলেকজান্ডার এবং রানী ম্যাক্সিমা হেগের 'হুইস টেন বস' রাজপ্রাসাদে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের জন্য আতিথ্য প্রদান করেন। মহামান্য রাজা ও রানী প্রধানমন্ত্রী মোদীর সম্মানে একটি মধ্যাহ্নভোজেরও আয়োজন করেন।
প্রধানমন্ত্রী জেটেন এবং প্রধানমন্ত্রী মোদী সীমিত পরিসরে এবং প্রতিনিধিদল পর্যায়ে আলোচনায় মিলিত হন; এরপর ১৬ মে সন্ধ্যায় তাঁদের সম্মানে একটি নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। উভয় প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী ও ঐতিহাসিক বাণিজ্যিক সংযোগ, গভীর শিকড়যুক্ত জনগণের-সঙ্গে-জনগণের সম্পর্ক এবং শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কথা সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করেন এবং এই বহুমুখী সম্পর্ককে আরও প্রসারিত ও গভীর করার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন। এই প্রেক্ষাপটে, দুই নেতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন সহযোগিতা কর্মসূচির ক্ষেত্রে অর্জিত অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়সহ বিভিন্ন স্তরে নিয়মিত মতবিনিময় এবং ২০২৩ সালে ভারতের জি-২০ সভাপতিত্বকালীন ও ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন দিল্লিতে অনুষ্ঠিত 'এআই ইমপ্যাক্ট সামিট'-এর সময়কার ফলপ্রসূ সহযোগিতার মাধ্যমে।
দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে জোরালো গতিশীলতা রয়েছে এবং ক্রমবর্ধমান অভিন্ন স্বার্থের বিষয়টিকে স্বীকৃতি জানিয়ে, দুই নেতা ভারত ও নেদারল্যান্ডসের সম্পর্ককে 'কৌশলগত অংশীদারিত্ব'-এর পর্যায়ে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেন। এই প্রসঙ্গে, তাঁরা একটি 'কৌশলগত অংশীদারিত্বের রূপরেখা' গ্রহণের বিষয়টিকে স্বাগত জানান। এই রূপরেখার আওতায় উভয় পক্ষ রাজনৈতিক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা, সাইবার নিরাপত্তা, সেমিকন্ডাক্টরসহ গুরুত্বপূর্ণ ও উদীয়মান প্রযুক্তি, মহাকাশ, এআই ও কোয়ান্টাম ব্যবস্থা, বিজ্ঞান ও উদ্ভাবন, সুস্থায়ী উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, সুস্থায়ী কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থা, জল ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানি রূপান্তর, সুস্থায়ী পরিবহন, সামুদ্রিক উন্নয়ন, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং জনগণের-সঙ্গে-জনগণের সম্পর্ক - সহ সকল ক্ষেত্রে নিয়মিত ও কাঠামোগত সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ করতে সম্মত হয়। এছাড়া, দুই পক্ষ নীতি পরিকল্পনা বা পলিসি প্ল্যানিংয়ের ক্ষেত্রেও পারস্পরিক বিনিময়ের সুযোগ অন্বেষণ করতে সম্মত হয়। এ প্রসঙ্গে, উভয় নেতা ডিসেম্বর ২০২৫-এ বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক ক্ষেত্রে সম্পাদিত চুক্তিগুলোকে স্বাগত জানান; যার মধ্যে রয়েছে প্রতিরক্ষা, সেমিকন্ডাক্টর ও সংশ্লিষ্ট উদীয়মান প্রযুক্তি, ডিজিটাল ও সাইবার ক্ষেত্রে বর্ধিত সহযোগিতা, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম খাতে যৌথ কার্যক্রম, একটি ‘যৌথ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কমিটি’ গঠন, এবং লোথাল ও আমস্টারডামের সামুদ্রিক জাদুঘরগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা।
উভয় নেতা ভবিষ্যতের অঙ্গীকারের বিষয়টি উল্লেখ করেন এবং রাষ্ট্রসংঘের সনদের উদ্দেশ্য ও নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা এবং একটি বিধি-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাসহ অভিন্ন মূল্যবোধ ও নীতিসমূহ সমুন্নত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। উভয় সরকারই বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও সংস্কার করার—যার অন্তর্ভুক্ত হলো সমসাময়িক বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ও অস্থায়ী উভয় ধরনের সদস্যপদ সম্প্রসারণ—বিষয়ে তাদের অঙ্গীকারের ওপর জোর দেয় এবং বাঁধাধরা সময়সীমার মধ্যে এ বিষয়ে লিখিত প্রস্তাব-ভিত্তিক আলোচনার আহ্বান জানায়। একটি সংস্কৃত ও সম্প্রসারিত রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ প্রাপ্তির লক্ষ্যে নেদারল্যান্ডসের অব্যাহত সমর্থনের জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদী, প্রধানমন্ত্রী জেটেনকে ধন্যবাদ জানান।
উভয় নেতা ভারত-ইইউ কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও গভীর করার বিষয়ে তাঁদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং এ প্রসঙ্গে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে পারস্পরিক লাভজনক ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁরা একমত হয়েছেন যে, ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের এই সময়ে, এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটি বিশ্বের দ্বিতীয় এবং চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ দুটির মধ্যেকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে সুদৃঢ় করবে; পাশাপাশি এটি মুক্ত অর্থনীতি এবং নিয়ম-ভিত্তিক বাণিজ্যের প্রতি তাঁদের যৌথ অঙ্গীকারকেও তুলে ধরবে। দুই নেতা নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব চুক্তির যুগপৎ স্বাক্ষরকেও স্বাগত জানিয়েছেন; যা নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক ইইউ এবং ভারতের সংলাপ ও সহযোগিতাকে জোরদার করবে এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন এবং প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতার মতো ক্ষেত্রগুলোতে সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত ফলাফল বয়ে আনবে।
আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা, নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা এবং কোনো প্রকার জবরদস্তিহীন বা সংঘাতমুক্ত পরিবেশের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের ওপর ভিত্তি করে একটি মুক্ত, উন্মুক্ত, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বের বিষয়ে নেতারা একমত পোষণ করেছেন। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগর বিষয়ক ইইউ কৌশলের কথা স্মরণ করে, প্রধানমন্ত্রী জেটেন ঘোষণা করেন যে নেদারল্যান্ডস ‘ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় উদ্যোগ’ (আইপিওআই)-এ যোগ দেওয়ার এবং জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যৌথভাবে এর ‘ সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সম্পদ বণ্টন’ বিষয়ক স্তম্ভটির নেতৃত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইউক্রেন প্রসঙ্গে, উভয় পক্ষ চলতি যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে; যুদ্ধ অব্যাহতভাবে ব্যাপক মানবিক দুর্ভোগ সৃষ্টি করে চলেছে এবং এর আন্তর্জাতিক প্রভাব রয়েছে। উভয় নেতা একমত হয়েছেন যে, রাষ্ট্রসংঘের সনদ এবং আন্তর্জাতিক আইনের মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে ইউক্রেনে একটি ব্যাপক, ন্যায়সঙ্গত এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলতি প্রচেষ্টাসমূহকে তাঁরা অব্যাহতভাবে সমর্থন করে যাবেন।
উভয় নেতা পশ্চিম এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং উল্লেখ করেছেন যে, এই পরিস্থিতির আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুদূরপ্রসারী ও গুরুতর প্রভাব রয়েছে—যার মধ্যে রয়েছে ব্যাপক মানবিক দুর্ভোগ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্য নেটওয়ার্কে সৃষ্ট ব্যাঘাত। নেতারা ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল ঘোষিত যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁরা উত্তেজনা প্রশমন, সংলাপ এবং কূটনীতির গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন এবং পশ্চিম এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আশা প্রকাশ করেছেন। তাঁরা ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা এবং বাণিজ্যের আন্তর্জাতিক প্রবাহ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন; একই সঙ্গে তাঁরা যে কোনো ধরনের বিধিনিষেধমূলক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন এবং এই লক্ষ্যে চলতি প্রচেষ্টা ও উদ্যোগগুলোর প্রতি তাঁদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ
উভয় নেতা উল্লেখ করেন যে, নেদারল্যান্ডস ও ভারতের মধ্যেকার অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব সহযোগিতার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। সুস্থায়ী উন্নয়ন, উদ্ভাবন এবং দীর্ঘমেয়াদী বৃদ্ধির মতো অভিন্ন অগ্রাধিকারগুলো দ্বারা চালিত এই অংশীদারিত্ব উভয় জাতির জন্য পারস্পরিক সমৃদ্ধি বয়ে আনছে। দক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং উন্মুক্ত বাজারের প্রতি অভিন্ন অঙ্গীকারের ওপর ভিত্তি করে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে যে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, নেতারা তাকে স্বাগত জানান। বিশ্বমানের লজিস্টিক নেটওয়ার্কের সুবাদে নেদারল্যান্ডস - বিশেষ করে এর রটারডাম বন্দরের মাধ্যমে - ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য ইউরোপে প্রবেশের একটি কৌশলগত প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে; অন্যদিকে, ভারতের বিশাল ও গতিশীল বাজার ডাচ কোম্পানিগুলোর জন্য অপার সম্ভাবনা উন্মুক্ত করে। ডাচ কোম্পানিগুলো এখানে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ, ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ এবং বিশাল ও দক্ষ জনশক্তির উপলব্ধতা থেকে ব্যাপকভাবে উপকৃত হতে পারে। একই সঙ্গে, ভারতীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো নেদারল্যান্ডসের উন্নত বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে পারে - বিশেষ করে জল ব্যবস্থাপনা, সুস্থায়ী কৃষি এবং স্মার্ট সিটি বা আধুনিক নগর উন্নয়ন খাতে।
দুই দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সহযোগিতায় সন্তোষ প্রকাশ করে নেতারা ভবিষ্যতে বৃদ্ধির আরও বিপুল সম্ভাবনার ওপর জোর দেন; বিশেষ করে ‘ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি’ থেকে উদ্ভূত সুযোগগুলোর প্রেক্ষাপটে এই সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। নেদারল্যান্ডস ভারতের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদার হিসেবে তার অবস্থান ধরে রেখেছে, যা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা ও দৃঢ়তারই প্রতিফলন।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও সহজতর করার লক্ষ্যে, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীগণ ‘শুল্ক সংক্রান্ত বিষয়ে পারস্পরিক প্রশাসনিক সহায়তা চুক্তি’ স্বাক্ষরের বিষয়টিকে স্বাগত জানান। এই চুক্তির ফলে দুইদেশের শুল্ক কর্তৃপক্ষের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা শুল্ক সংক্রান্ বিধিবিধানের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে এবং ভারত ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে বৈধ বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে সহায়তা করবে।
নেতারা ‘ভারত-নেদারল্যান্ডস যৌথ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কমিটি’ এবং ‘ফাস্ট ট্র্যাক মেকানিজম’-এর মতো বিভিন্ন কাঠামোর মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে আরও অগ্রসর করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। সুস্থায়ী বৃদ্ধি অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শক্তিশালী সরবরাহ বা মূল্য-শৃঙ্খল গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিনিয়োগ প্রক্রিয়াকে সহজতর করা এবং উদ্ভাবন-সহায়ক পরিবেশ বা ইকোসিস্টেমকে শক্তিশালী করার ওপর মনোযোগ নিবদ্ধ করতে তাঁরা সম্মত হন।
উভয় প্রধানমন্ত্রী স্টার্টআপ এবং উদ্ভাবন খাতে সহযোগিতার বিপুল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তাঁরা উল্লেখ করেন যে, ভারত ও নেদারল্যান্ডসে উদ্ভাবিত বিভিন্ন সমাধান বা প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে - বিশেষ করে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারগুলোতে - ব্যাপক পরিসরে ছড়িয়ে পড়ার বা সম্প্রসারিত হওয়ার সক্ষমতা রাখে। দুই দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমগুলোকে আরও নিবিড়ভাবে সংযুক্ত করা, পারস্পরিক আদান-প্রদান সহজতর করা এবং ‘ডিজিটাল সফট-ল্যান্ডিং প্রোগ্রাম’-এর মতো উদ্যোগগুলো খতিয়ে দেখার বিষয়ে তাঁরা সম্মত হন। পাশাপাশি, বাণিজ্য মিশন, উদ্ভাবন মিশন এবং প্রযুক্তি সম্মেলনে উভয় দেশের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির বিষয়েও তাঁরা একমত পোষণ করেন।
প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা
উভয় নেতা প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ক ইচ্ছাপত্র স্বাক্ষরের বিষয়টিকে স্বাগত জানান। তাঁরা দুই দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ এবং কর্মী পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন; যার উদ্দেশ্য হলো তথ্য বিনিময়, সফর, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সমন্বয় সাধন করা। তাঁরা দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতার পরিধি আরও সম্প্রসারিত করার বিষয়েও একমত হন।
উভয় নেতা ইইউ কাঠামোর আওতায় এবং অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও সম্মত হন। তাঁরা একটি 'প্রতিরক্ষা শিল্প রোডম্যাপ' প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেন। এই রোডম্যাপে দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে—যৌথ উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং যৌথ উৎপাদনের জন্য যৌথ উদ্যোগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে - প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, ব্যবস্থা, যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা তৈরির ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতার রূপরেখা তুলে ধরা হবে।
উভয় নেতা নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার করতে সম্মত হন। এর অংশ হিসেবে দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে ঐতিহ্যবাহী ও অ-ঐতিহ্যবাহী নিরাপত্তা বিষয়ক ইস্যুতে - যার মধ্যে রয়েছে প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ ও উদীয়মান প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মত অন্যান্য বিষয় - নিয়মিত তথ্য ও মতবিনিময় অব্যাহত থাকবে।
উভয় নেতা বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক সাইবার পরামর্শ সভা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি, একটি উন্মুক্ত, মুক্ত ও নিরাপদ সাইবার জগত নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দুই দেশের সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করার মাধ্যম হিসেবে 'অনলাইন সাইবার স্কুল'-এর অষ্টম অধিবেশন আয়োজনের বিষয়টিকেও তাঁরা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন। এই প্রেক্ষাপটে, সাইবার জগতে বর্ধিত সহযোগিতার লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত 'ইচ্ছাপত্র'-কে নেতারা স্বাগত জানান। এই সহযোগিতার আওতায় বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোতে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে সাইবার হুমকি ও সাইবার অপরাধ দমনে যৌথ প্রচেষ্টা চালানোর বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
উভয় নেতা একটি উন্মুক্ত, মুক্ত, নিরাপদ, স্থিতিশীল, সহজলভ্য এবং শান্তিপূর্ণ আইসিটি পরিবেশের গুরুত্বের ওপর জোর দেন; যা উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম সহায়ক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। এ প্রসঙ্গে, প্রধানমন্ত্রী মোদী ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এআই ইমপ্যাক্ট সামিট-এ নেদারল্যান্ডসের গঠনমূলক অংশগ্রহণের জন্য দেশটির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী জেটেন এপ্রিল ২০২৫ সালে ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের পহলগামে অসামরিক নাগরিকদের ওপর সংঘটিত জঘন্য ও ঘৃণ্য সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানান। সন্ত্রাসবাদের - যার মধ্যে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদও অন্তর্ভুক্ত—বিরুদ্ধে ভারতের লড়াইয়ে নেদারল্যান্ডসের সংহতি ও অবিচল সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। পাশাপাশি, উভয় নেতা এই হামলার হোতাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার আহ্বান জানান। দুই প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাসবাদের সকল রূপ ও প্রকাশভঙ্গির দ্ব্যর্থহীন নিন্দা জানান। তাঁরা সন্ত্রাসবাদের প্রতি শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণের আহ্বান জানান এবং সন্ত্রাস দমনে দ্বিমুখী আচরণের তীব্র বিরোধিতা করেন।
উভয় নেতা দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক—উভয় কাঠামোর মাধ্যমেই, যার মধ্যে রাষ্ট্রসংঘ ও এফএটিএফ-এর মতো সংস্থাগুলোও অন্তর্ভুক্ত - সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে একটি ব্যাপক ও ধারাবাহিক লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর পুনরায় জোর দেন। এছাড়া তাঁরা সকল সন্ত্রাসবাদী ও সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান; এই গোষ্ঠীগুলির মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১২৬৭ নিষেধাজ্ঞা কমিটি কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনসমূহ, এবং তাদের হয়ে কাজ করা প্রক্সি বা ছায়া সংগঠন, সহযোগী, পৃষ্ঠপোষক, সমর্থক ও অর্থদাতারা। উভয় পক্ষই বিশ্বের সকল দেশের প্রতি আহ্বান জানায় যেন তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনে সন্ত্রাসবাদীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ও পরিকাঠামো নির্মূলের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে; পাশাপাশি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ও তাদের অর্থায়নের পথ বন্ধ করে এবং সন্ত্রাসবাদের হোতাদের দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে আসে। প্রধানমন্ত্রী জেটেন 'সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক রাষ্ট্রসংঘের ব্যাপক কনভেনশন' প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভারতের প্রচেষ্টার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন।
উভয় নেতাই উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করেন যে, সন্ত্রাসবাদী উদ্দেশ্যে নতুন ও উদীয়মান প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমশ হুমকি হয়ে উঠছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো - চালকবিহীন বিমান ব্যবস্থা, সন্ত্রাসবাদী ও সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা ভার্চুয়াল সম্পদের ব্যবহার, এবং উগ্রবাদ ছড়ানোর কাজে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অপব্যবহার।
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই এবং এ বিষয়ে বৈশ্বিক সহযোগিতার কাঠামোকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে নিজেদের অভিন্ন অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করে, উভয় নেতা এই বিষয়টির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন যে -সকল দেশেরই অর্থ পাচার প্রতিরোধ এবং সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন দমনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডগুলো কঠোরভাবে মেনে চলা উচিত।
নতুন নতুন প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, বিজ্ঞান এবং শিক্ষা
উভয় নেতা 'সেমিকন্ডাক্টর এবং সংশ্লিষ্ট উদীয়মান প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব' বিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়টিকে স্বাগত জানান। এই সমঝোতা স্মারকটি সেমিকন্ডাক্টর ক্ষেত্রে - যার মধ্যে বিনিয়োগ, গবেষণা এবং মেধা বিনিময়ের ক্ষেত্রগুলো অন্তর্ভুক্ত - নিবিড় সহযোগিতার একটি রূপরেখা প্রদান করে।
উভয় নেতা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে উভয় দেশের মধ্যে চলতে থাকা সহযোগিতার আবহকে স্বাগত জানান। এই সহযোগিতার মূল লক্ষ্য হলো সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা এবং সরকার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও জ্ঞান-ভিত্তিক সংস্থাগুলোর বিশেষজ্ঞ দক্ষতাকে সংযুক্ত করা। এই কর্মসূচিটি 'বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবন বিষয়ক যৌথ কার্যনির্বাহী গোষ্ঠী'-র মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে যৌথ গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্প, মেধার অবাধ আদান প্রদান এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়গুলোকে সহজতর করে তোলে। উভয় নেতা বিগত বছরগুলোতে যৌথভাবে চালু করা প্রায় পঞ্চাশটি বৃহৎ গবেষণা ও উদ্ভাবন কর্মসূচির কথা স্মরণ করেন এবং মূল সক্ষমকারী প্রযুক্তি-র ক্ষেত্রে অব্যাহত সহযোগিতার ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের ওপর জোর দেন। এই সহযোগিতার লক্ষ্য হলো যৌথ সমাধানের মাধ্যমে সমাজের সাধারণ চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলা করা।
উভয় নেতা 'ডাচ সেমিকন কম্পিটেন্স সেন্টার'-কে ইন্ডিয়ান সেমিকন্ডাক্টর মিশন-এর সঙ্গে সংযুক্ত করার উদ্যোগকেও স্বাগত জানান। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো সহযোগিতা, প্রযুক্তি এবং মেধা বিকাশের মাধ্যমে সেমিকন্ডাক্টর ক্ষেত্রকে - বিশেষ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ, স্কেল-আপ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং তাদের সরবরাহকারীদের - সহায়তা ও শক্তিশালী করা। এছাড়া, উভয় প্রধানমন্ত্রী 'ইন্দো-ডাচ সেমিকন অনলাইন স্কুল' এবং এর পরবর্তী ধাপের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার বিষয়টিকেও অত্যন্ত প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখেন।
উভয় নেতা একটি 'সহযোগিতা স্মারক' গ্রহণের বিষয়কে স্বাগত জানান। এই স্মারকটি আইন্দহোভেন ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি এবং ইউনিভার্সিটি অফ টুয়েনটি-এর সঙ্গে ভারতের ছয়টি শীর্ষস্থানীয় কারিগরি প্রতিষ্ঠানের (আইআইএসসি ব্যাঙ্গালুরু, আইআইটি বোম্বে, আইআইটি দিল্লি, আইআইটি গান্ধীনগর, আইআইটি গুয়াহাটি, এবং আইআইটি মাদ্রাজ) মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো সেমিকন্ডাক্টর এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটি 'মেধা-সেতু' স্থাপন করা, যেখানে এনএক্সপি, এএসএমএল,টাটা এবং সিজি সেমি-এর মতো শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অংশীদারিত্বও যুক্ত থাকবে। এই উদ্যোগটি উভয় পক্ষের শিক্ষাঙ্গন ও শিল্পখাতের অংশগ্রহণের মাধ্যমে গবেষণা ও উন্নয়ন এবং মেধা বিকাশের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে।
অবিরাম উদ্ভাবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ-র কৌশলগত গুরুত্ব এবং একটি স্থিতিস্থাপক ও সুস্থায়ী সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে, উভয় নেতা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের মূল্য-শৃঙ্খল জুড়ে সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়ে পারস্পরিক আগ্রহ প্রকাশ করেন। এই সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে অনুসন্ধান, গবেষণা ও উদ্ভাবন, মূল্য-শৃঙ্খলের একীকরণ, সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা, বৃত্তাকার অর্থনীতি, ইএসজি মানদণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট মূল্যায়ন কার্যক্রম। এই প্রেক্ষাপটে, উভয় নেতা 'গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ বিষয়ক সমঝোতা স্মারক' স্বাক্ষরের বিষয়টিকে স্বাগত জানান। উভয় নেতা ভারত সরকারের শিক্ষা মন্ত্রক এবং নেদারল্যান্ডস সরকারের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান মন্ত্রকের মধ্যে উচ্চশিক্ষা বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন। নিজ নিজ শিক্ষাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকার এবং চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, দুই দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যেই এই সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
উভয় নেতাই ডাচ ও ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে চলমান প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে সাম্প্রতিক কিছু সহযোগিতামূলক উদ্যোগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; যেমন—গ্রোনিঞ্জেন বিশ্ববিদ্যালয় ও নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যকার সহযোগিতা; ডেলফট ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি ও মুম্বাই মেট্রোপলিটন রিজিওনাল ডেভেলপমেন্ট অথরিটির মধ্যকার সহযোগিতা; সার্ভে অফ ইন্ডিয়া ও আইটিসি (টুয়েন্তে বিশ্ববিদ্যালয়)-এর মধ্যকার সহযোগিতা; ভ্রিজে ইউনিভার্সিটি আমস্টারডাম ও ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (আইআইটি) রুরকির মধ্যকার সহযোগিতা এবং আরও অনেক অনুরূপ উদ্যোগ। উভয় নেতাই স্বীকার করেছেন যে, ‘ইন্দো-ডাচ শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক’-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিষয়ক পারস্পরিক সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
উভয় নেতা ভারত ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে মহাকাশ বিষয়ক বর্তমান অংশীদারিত্বের বিষয়টি স্বীকার করেছেন এবং এই সহযোগিতাকে আরও জোরদার করার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন, জল সংক্রান্ত সমস্যা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং বায়ুর গুণমানসহ বিভিন্ন সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মহাকাশ-ভিত্তিক প্রযুক্তি ও অ্যাপ্লিকেশনগুলোর ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই সহযোগিতা বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে বলে তাঁরা অভিমত প্রকাশ করেন।
শক্তি নিরাপত্তা ও রূপান্তর / বৃত্তাকার অর্থনীতি
জৈব-জ্বালানি এবং জৈব-রসায়নের ক্ষেত্রে সক্রিয় দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে, প্রধানমন্ত্রী মোদী 'গ্লোবাল বায়োফুয়েল অ্যালায়েন্স'-এ নেদারল্যান্ডসের যোগদানের বিষয়টিকে স্বাগত জানান; এই জোটটি ভারতের জি২০ সভাপতিত্বকালে চালু করা হয়েছিল। দুই প্রধানমন্ত্রী জৈব-অর্থনীতির ক্ষেত্রে কাজ করার বিষয়ে তাঁদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন এবং 'বায়োরিফাইনারি বিষয়ক মিশন ইনোভেশন কর্মসূচি'-র সাফল্যের কথা তুলে ধরেন - যে কর্মসূচির যৌথ সভাপতিত্বে ছিল ভারত ও নেদারল্যান্ডস।
বর্জ্য থেকে মূল্য সংযোজন বিষয়ক চলমান সহযোগিতার কথা স্বীকার করে নেতারা উল্লেখ করেন যে, 'ডাচ জাতীয় বৃত্তাকার অর্থনীতি কর্মসূচি ২০২৩-২০৩০'-এর ২০২৫ সালের সাম্প্রতিকতম সংস্করণ এবং 'বিশ্ব বৃত্তাকার অর্থনীতি ফোরাম' ২০২৬-এর ভারতের সভাপতিত্ব—এই অংশীদারিত্বকে নতুন নতুন ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত করার সুযোগ করে দেবে। এর অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে শিল্পক্ষেত্রে বৃত্তাকার অর্থনীতি, সুস্থায়ী ও জলবায়ু-সহনশীল নগর ব্যবস্থার জন্য কঠিন ও তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা - যা পাইলট ও সম্প্রসারণযোগ্য প্রকল্পগুলোতে প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে; এছাড়া রয়েছে উদ্ভাবনের প্রবর্তন এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি—যেমন বি টু বি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে; আর এই লক্ষ্যেই ডাচ কোম্পানিগুলোকে 'সম্পদ দক্ষতা ও বৃত্তাকার অর্থনীতি শিল্প জোট'-এ যোগদানের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। টেকসই চলাচলের ক্ষেত্রে, স্মার্ট ও আন্তঃ-পরিচালনযোগ্য চার্জিং পরিকাঠামো, ব্যাটারি প্রযুক্তি ও সিস্টেম একীকরণ, মানকীকরণ ও উন্মুক্ত প্রোটোকল, ভারী ও মাঝারি-ভারী শূন্য-নির্গমন যান, স্মার্ট নগর পরিবহন ব্যবস্থা ও বহুমুখী একীকরণ, এবং বিকল্প জ্বালানি ও সক্রিয় চলাচলের মতো ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা আরও গভীর করা যেতে পারে।
নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে ভারত ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যকার অংশীদারিত্বকে আরও জোরদার করার লক্ষ্যে, দুই নেতা 'নবায়নযোগ্য শক্তি বিষয়ক সমঝোতা স্মারক'-এর অধীনে একটি যৌথ কার্যনির্বাহী গোষ্ঠী গঠনের বিষয়টিকে স্বাগত জানান। এই গোষ্ঠীটি নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য একটি বৈচিত্র্যময় কর্মপন্থা বা এজেন্ডা নির্ধারণের ব্যাপক সুযোগ করে দেবে—যার অন্তর্ভুক্ত থাকবে উদ্ভাবনী সৌরশক্তি, সবুজ হাইড্রোজেন, শক্তি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে বিনিয়োগের বিষয়গুলো, যা সামগ্রিক শক্তি রূপান্তর প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে সহায়তা করবে।
নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতা এবং দ্বিমুখী বিনিয়োগকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে, নেতারা 'সবুজ হাইড্রোজেন উন্নয়ন বিষয়ক ভারত-নেদারল্যান্ডস উচ্চাভিলাষী রূপরেখা উন্মোচন করেন। নেতারা একমত হন যে, এই রূপরেখাটি সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদন, ব্যবহার ও রপ্তানির ক্ষেত্রে ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, বিশাল সম্ভাবনা এবং প্রতিযোগিতামূলক সুবিধাসমূহকে সহায়তা প্রদান করবে; একইসঙ্গে এটি উভয় দেশেই নবায়নযোগ্য শক্তির একটি টেকসই উৎস হিসেবে সবুজ হাইড্রোজেনকে দ্রুততরভাবে গ্রহণ ও প্রচলনেও অবদান রাখবে। এর পাশাপাশি, নীতি আয়োগ এবং নেদারল্যান্ডসের মধ্যে ‘শক্তি রূপান্তরের লক্ষ্যে সক্ষমতা বৃদ্ধি বিষয়ক যৌথ অভিপ্রায় বিবৃতি’-র নবায়ন, শক্তি নিরাপত্তা ও রূপান্তর ক্ষেত্রগুলোতে অব্যাহত সহযোগিতার বিষয়টি নিশ্চিত করবে।
তাছাড়া, শিক্ষাগত সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে গ্রোনিঞ্জেন বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯টি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়াকে দুই নেতা স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁরা আরও স্বাগত জানিয়েছেন ভারত সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ এবং আরইউজি-র মধ্যে ‘হাইড্রোজেন বিষয়ক পিএইচডি ফেলোশিপ কর্মসূচি’ প্রবর্তনের বিষয়টিকে।
জল ব্যবস্থাপনা
দুই নেতা ‘জলসংক্রান্ত কৌশলগত অংশীদারিত্ব’-এর আওতায় অর্জিত অগ্রগতির বিষয়টি উল্লেখ করেন। তাঁরা লক্ষ্য করেন যে, ভারতের জলসংক্রান্ত চাহিদা এবং নেদারল্যান্ডসের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মধ্যে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমেই এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। উভয় প্রধানমন্ত্রীই জল ও নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গৃহীত যৌথ প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন। এই প্রচেষ্টার মধ্যে রয়েছে ‘নমামি গঙ্গে মিশন’-এ অংশীদারিত্ব; ‘ওয়াটার অ্যাজ লিভারেজ’ -এর সঙ্গে সমন্বিত ‘নগর নদী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা’-র মাধ্যমে জলবায়ু সহনশীল নগর জল ব্যবস্থাপনা; ব-দ্বীপ ব্যবস্থাপনা; জলর গুণমান ব্যবস্থাপনা; বর্জ্য জলর পুনঃব্যবহার এবং নতুন জল প্রযুক্তির প্রবর্তন। উভয় নেতাই নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং সবার জন্য বিশুদ্ধ জলর সহজলভ্যতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘ওয়াশ’ বা জল, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ক উন্নয়ন প্রকল্পে টেকসই অর্থায়নে নেদারল্যান্ডসের অবদানের কথা স্বীকার করেন, যা ভারতের ‘স্বচ্ছ ভারত মিশন’-এর লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
উভয় নেতা দিল্লি আইআইটি -তে একটি ‘জল বিষয়ক উৎকর্ষ কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে স্বাগত জানান। এই কেন্দ্রটি ভারত সরকারের ‘জলশক্তি মন্ত্রক’-এর তত্ত্বাবধানে এবং নেদারল্যান্ডস সরকারের ‘পরিকাঠামো ও জল ব্যবস্থাপনা মন্ত্রক’-এর সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া, উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু এবং কেরালা - এই রাজ্যগুলোতে চলমান বিভিন্ন যৌথ কর্মসূচির অগ্রগতিও নেতারা লক্ষ্য করেন।
উভয় নেতা গুজরাটের ‘কালপসার প্রকল্প’-এ পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে সম্মত হন। এই প্রকল্পে নেদারল্যান্ডসের দক্ষতা ও কারিগরি সহায়তা কাজে লাগিয়ে ‘জলসংক্রান্ত কৌশলগত অংশীদারিত্ব’-কে আরও সুদৃঢ় করা সম্ভব বলে তাঁরা মনে করেন।
নেতারা ভারতের নেতৃত্বে গঠিত বৈশ্বিক জোট ‘দুর্যোগ সহনশীল পরিকাঠামো জোট’-এর ‘নগর জল অবকাঠামো সহনশীলতা কর্মসূচি’-তে এ পর্যন্ত অর্জিত অগ্রগতির বিষয়টিও উল্লেখ করেন। এই জোটের সদস্য হিসেবে নেদারল্যান্ডস তাদের নিজস্ব দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা এই কর্মসূচির মাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে বিনিময় করে থাকে। উভয় নেতা এই কর্মসূচির আওতায় প্রণীত প্রশিক্ষণ কার্যক্রমটি চালু হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন—যা ভারতের বিভিন্ন শহরে ‘জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ’ -এর সহযোগিতায় এবং বিশ্বজুড়ে সিডিআরআই-এর ৫০টিরও বেশি সদস্য দেশের অন্যান্য স্থানে বাস্তবায়িত হবে।
সামুদ্রিক উন্নয়ন
দুই প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি নবায়নকৃত ‘সামুদ্রিক সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক’-এর বিষয়টি উল্লেখ করেন। তাঁরা একটি নিরাপদ, সুরক্ষিত ও টেকসই সামুদ্রিক খাত গড়ে তোলার লক্ষ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। এর অংশ হিসেবে, তাঁরা ভারত ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে একটি কৌশলগত ‘সবুজ ও ডিজিটাল সমুদ্র করিডোর’ গড়ে তোলার বিষয়টিকেও সমর্থন জানান - যার রূপরেখা অক্টোবর ২০২৫-এ স্বাক্ষরিত উদ্দেশ্যপত্রে বর্ণিত রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, তাঁরা বন্দর ও অভ্যন্তরীণ নৌপথের স্মার্ট ও টেকসই উন্নয়ন, সরবরাহ শৃঙ্খলের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব বন্দর ও নৌ-পরিবহন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তাঁদের অংশীদারিত্বকে আরও গভীর ও বিস্তৃত করতে সম্মত হন। পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে, উভয় প্রধানমন্ত্রী একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সবুজ ও ডিজিটাল সমুদ্র করিডোর বিষয়ক কৌশলগত রূপরেখা’ প্রণয়নের সম্ভাবনা যাচাই করতে সম্মত হয়েছেন; যার লক্ষ্য হলো ভারত ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে একটি পরিবেশগতভাবে টেকসই, ডিজিটালভাবে সমন্বিত এবং অর্থনৈতিকভাবে দক্ষ ও ভবিষ্যতের উপযোগী সামুদ্রিক করিডোর গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করা।
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা - বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে - উভয় দেশের অভিন্ন স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে, উভয় প্রধানমন্ত্রীই সর্বোত্তম অনুশীলন বা ‘বেস্ট প্র্যাকটিসেস’ বিনিময়ে সম্মত হয়েছেন। এই বিনিময় কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং জ্ঞান-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পরিচালিত হবে; যার মূল লক্ষ্য হবে বন্দর ও অভ্যন্তরীণ নৌপথের সাইবার সহনশীলতাসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং বৈচিত্র্যময় ও স্থিতিস্থাপক সরবরাহ শৃঙ্খল - যার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল, ঔষধ ও খাদ্য—এর প্রসার ঘটানো।
স্বাস্থ্য খাত
উভয় নেতাই স্বাস্থ্য খাতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধির গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন; বিশেষ করে সংক্রামক রোগ ও অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের (ঔষধ-প্রতিরোধ ক্ষমতা) মতো বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় এবং অসংক্রামক রোগগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিরসনে এই সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি বলে তাঁরা মনে করেন। ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা (যার অন্তর্ভুক্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সাইবার নিরাপত্তা) এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আরও অধিক সহযোগিতার প্রসারে উভয় নেতাই সম্মত হয়েছেন। স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সমঝোতা স্মারকটি নবায়ন করাকে এবং নারী স্বাস্থ্য, জলবায়ু ও স্বাস্থ্যগত প্রস্তুতি বিষয়ক সক্ষমতা উন্নয়ন, এবং উভয় দেশের টেকসই স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা নিয়ে জ্ঞান বিনিময়ের মতো ক্ষেত্রগুলোতে নতুন সহযোগিতামূলক উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়টিকে তাঁরা স্বাগত জানিয়েছেন। এই নবায়নকৃত সমঝোতা স্মারকের আলোকে, উভয় নেতা নেদারল্যান্ডসের 'ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক হেলথ অ্যান্ড দ্য এনভায়রনমেন্ট' এবং ভারতের 'ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চ' (আইসিএমআর)-এর মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ইচ্ছাপত্র-কেও স্বাগত জানিয়েছেন। এই ইচ্ছাপত্রে সংক্রামক রোগ, বাহক-বাহিত রোগ, 'ওয়ান হেলথ' এবং রোগ নজরদারির মতো ক্ষেত্রগুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
উভয় নেতা আরও জোর দিয়ে বলেছেন যে, ভারত-নেদারল্যান্ডস কৌশলগত অংশীদারিত্বের কাঠামোর আওতায়, উচ্চমানের, সহজলভ্য, নিরাপদ এবং টেকসই স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ওষুধ শিল্প ও চিকিৎসা সরঞ্জাম খাতে সহযোগিতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এই নবস্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের অধীনে ২০২৬ সালে প্রথম যৌথ কার্যনির্বাহী দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এই বৈঠকে সমঝোতা স্মারক ও এর কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং এর ভবিষ্যৎ উন্নয়নের বিষয়ে আলোচনা করা হবে; পাশাপাশি শিক্ষাগত সহযোগিতা, নিয়ন্ত্রণমূলক সহযোগিতা, ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ সংক্রান্ত জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে সহযোগিতার মূল ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা হবে।
কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থা
কৃষি, খাদ্য ব্যবস্থা এবং দায়িত্বশীল মূল্য শৃঙ্খল খাতে ভারত ও নেদারল্যান্ডসের চলমান সহযোগিতার বিষয়টি উভয় নেতা সন্তোষের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে 'কৃষি বিষয়ক যৌথ কার্যনির্বাহী দলের' মাধ্যমে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সুরক্ষিত চাষাবাদ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, দুগ্ধ ও পোল্ট্রি খাতে ভারতে ডাচ কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিকে নেতারা স্বাগত জানিয়েছেন। কৃষি-প্রযুক্তি সহ কৃষি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভারতীয় ও ডাচ কোম্পানিগুলোর মধ্যে সহযোগিতার সুযোগগুলোকে কাজে লাগানোর গুরুত্বের ওপর নেতারা জোর দিয়েছেন।
ডাচ বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় ভারতে কৃষি-সম্পর্কিত বিভিন্ন খাতে উৎকর্ষ কেন্দ্র স্থাপনের অগ্রগতির বিষয়টি নেতারা পর্যালোচনা করেছেন। এই কেন্দ্রগুলো উচ্চ-প্রযুক্তি সম্পন্ন গ্রিনহাউস কৃষি উৎপাদনে প্রযুক্তির প্রসার ঘটাচ্ছে; পাশাপাশি ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য উন্নত কৃষি উপকরণ সরবরাহ ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। এর ফলে কৃষিক্ষেত্রে অধিকতর স্থায়িত্ব ও উচ্চতর উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত হচ্ছে এবং জল ও কৃষি-রাসায়নিকের ব্যবহার হ্রাস পাচ্ছে। নেতৃবৃন্দ নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতা এবং জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে কেন্দ্রগুলোর প্রভাব ও কার্যকারিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে তাঁদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তাঁরা খাদ্য ব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতেও সম্মত হয়েছেন।
নেতৃবৃন্দ মৎস্য, পশুপালন ও দুগ্ধজাত দ্রব্য বিষয়ক মন্ত্রক এবং নেদারল্যান্ডসের কৃষি, মৎস্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও প্রকৃতি বিষয়ক মন্ত্রকের মধ্যে একটি যৌথ ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরের বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন। পাশাপাশি, বেঙ্গালুরুর ‘সেন্টার অফ এক্সিলেন্স ফর অ্যানিমাল হাজব্যান্ড্রি’-তে দুগ্ধশিল্প বিষয়ক প্রশিক্ষণের জন্য একটি ‘ইন্দো-ডাচ সেন্টার অফ এক্সিলেন্স’ প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকেও তাঁরা স্বাগত জানিয়েছেন। উভয় পক্ষই দুগ্ধশিল্প এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কৃষি খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার সম্ভাবনাগুলো খতিয়ে দেখতে সম্মত হয়েছে।
নেতৃবৃন্দ উদ্যানপালন খাতে ভারত-নেদারল্যান্ডস সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে চলমান কার্যক্রমের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। ভারতের চলমান ‘ক্লিন প্ল্যান্ট কর্মসূচি’-এর আওতায় ‘ক্লিন প্ল্যান্ট সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে; যার মূল লক্ষ্য হলো উচ্চমূল্যের উদ্যানজাত ও ফলজ ফসলের রোগমুক্ত ও উন্নত মানের চারা বা রোপণ সামগ্রীর প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, যাতে ভারতীয় উদ্যানপালন খাত বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় সক্ষম হয়ে উঠতে পারে। এ প্রসঙ্গে, নেতৃবৃন্দ নাকটুইনবাউ এবং ভারত সরকারের কৃষি ও কৃষক কল্যাণ দপ্তরের অধীনস্থ ‘ন্যাশনাল হর্টিকালচার বোর্ড’-এর মধ্যে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সহায়তা বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন।
খাদ্য নিরাপত্তা ও সুরক্ষার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে, উভয় দেশের নেতৃবৃন্দ ‘নেদারল্যান্ডস ফুড অ্যান্ড কনজিউমার প্রোডাক্ট সেফটি অথরিটি’ এবং ‘ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া’-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটিকে স্বাগত জানিয়েছেন।
জন-পর্যায়ের আদান-প্রদান ও সংস্কৃতি
দুই প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের জনগণের মধ্যকার সুদৃঢ় সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন, যা ভারত-নেদারল্যান্ডস সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত। প্রধানমন্ত্রী জেটেন নেদারল্যান্ডসে বসবাসরত ভারতীয় সম্প্রদায় ডাচ সমাজের উন্নয়নে যে অবদান রেখেছে, তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। উভয় নেতা দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ আরও সহজতর করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন; বিশেষ করে তরুণ সমাজ, শিক্ষাঙ্গন, পেশাজীবী মহল, ক্রীড়া এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে এই যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়।
দুই দেশের মধ্যে সুষ্ঠু অভিবাসন ও চলাচলের সুযোগ তৈরির গুরুত্ব অনুধাবন করে, উভয় নেতা 'অভিবাসন ও চলাচল বিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়টিকে স্বাগত জানান।
দুই দেশ অবৈধ অভিবাসন ও মানব পাচার প্রতিরোধ এবং তা দমনে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে সম্মত হয়। পাশাপাশি, অত্যন্ত দক্ষ পেশাজীবীদের সুষ্ঠু ও বৈধ চলাচলে উৎসাহিত করার বিষয়েও তারা একমত হন। এই দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড দ্বারা পরিচালিত, যা অভিবাসী কর্মীদের মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে আচরণের নিশ্চয়তা দেয় - যার অন্তর্ভুক্ত হলো সুষ্ঠু চলাচলের সুযোগ, স্বচ্ছ ভিসা প্রক্রিয়া এবং কর্মীদের অধিকার সুরক্ষা।
দুই প্রধানমন্ত্রী বর্ধিত সাংস্কৃতিক সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের সাংস্কৃতিক বন্ধন আরও গভীর করতে সম্মত হন। এর অংশ হিসেবে নকশা (ডিজাইন), পরিবেশন শিল্পকলা, দৃশ্যকলা, জাদুঘর ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ—প্রভৃতি ক্ষেত্রে পারস্পরিক জ্ঞান ও বোঝাপড়া বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগকে উৎসাহিত করার বিষয়ে তারা একমত হন। এছাড়া, 'সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বিষয়ক একটি যৌথ কার্যনির্বাহী গোষ্ঠী গঠনের সম্ভাবনা নিয়েও তারা নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় করেন।
পারস্পরিক সাংস্কৃতিক কদর ও মূল্যায়নের গুরুত্ব তুলে ধরে, উভয় নেতা 'ড্রেন্টস মিউজিয়াম' -এ অমৃতা শের-গিলের শিল্পকর্মের প্রদর্শনী আয়োজনের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন। উল্লেখ্য, ড্রেন্টস মিউজিয়াম এবং ভারতের 'ন্যাশনাল গ্যালারি অফ মডার্ন আর্ট'-এর মধ্যকার একটি সমঝোতা স্মারকের অংশ হিসেবেই এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া, 'ন্যাশনাল গ্যালারি অফ মডার্ন আর্ট'-এ ভ্যান গগ এবং নেদারল্যান্ডসের অন্যান্য শিল্পীদের শিল্পকর্ম নিয়ে আয়োজিত ফিরতি প্রদর্শনীর জন্যও তারা অধীর আগ্রহ প্রকাশ করেন।
উভয় প্রধানমন্ত্রী সাংস্কৃতিক নিদর্শন ও পুরাকীর্তিগুলো তাদের মূল স্থানে ফিরিয়ে দেওয়া বা প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্বের ওপর জোর দেন। এ প্রসঙ্গে, 'লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়' থেকে চোল যুগের তাম্রলিপিগুলো ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টিকে তারা স্বাগত জানান।
ভারত ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যকার শতবর্ষ প্রাচীন দ্বিপাক্ষিক সামুদ্রিক ইতিহাসের কথা স্মরণ করে, উভয় নেতা একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়টিকে স্বাগত জানান। এই সমঝোতা স্মারকের আওতায় আমস্টারডামের 'ন্যাশনাল মেরিটাইম মিউজিয়াম' এবং ভারতের 'বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথ মন্ত্রক' যৌথভাবে গুজরাটের লোথালে জাতীয় সামুদ্রিক ঐতিহ্য কমপ্লেক্স গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহযোগিতা প্রদান করবে। আলোচনাটি অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় এবং উভয় নেতা ভারত-নেদারল্যান্ডস কৌশলগত অংশীদারিত্বের রূপরেখার আওতাভুক্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও বহুমুখী সহযোগিতার আরও সম্প্রসারণের বিপুল সম্ভাবনা সম্পর্কে তাঁদের আস্থার কথা ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী মোদী উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য প্রধানমন্ত্রী জেটেনকে ধন্যবাদ জানান এবং তাঁর সুবিধাজনক নিকটতম সময়ে ভারত সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রী জেটেনকে আমন্ত্রণ জানান।
SC/SB/AS
(রিলিজ আইডি: 2261986)
ভিজিটরের কাউন্টার : 6