প্রধানমন্ত্রীরদপ্তর
azadi ka amrit mahotsav

হিন্দুস্তান টাইমস লিডারশিপ সামিট ২০২৪-এ প্রধানমন্ত্রী’র ভাষণ

প্রকাশিত: 16 NOV 2024 1:27PM by PIB Kolkata

নতুন দিল্লি, ১৬ নভেম্বর, ২০২৪

 

নমস্কার আপনাদের সকলকে!
এক শতাব্দী আগে, হিন্দুস্তান টাইমস-এর উদ্বোধন করেছিলেন শ্রদ্ধেয় বাপু। তিনি ছিলেন গুজরাটি ভাষী, আর আজ, ঠিক ১০০ বছর পর, আপনারা আমন্ত্রণ জানিয়েছেন আরেকজন গুজরাটিকে। আমি হিন্দুস্তান টাইমস পরিবারকে এবং গত ১০০ বছরের এই ঐতিহাসিক যাত্রার সঙ্গে যুক্ত সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই—যাঁরা একে লালন করেছেন, যাঁরা নানা বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও স্থির থেকেছেন, যাঁরা সংগ্রাম করেছেন কিন্তু হাল ছাড়েননি—তাঁদের প্রত্যেকেই আজ অভিনন্দনের যোগ্য, শ্রদ্ধার দাবিদার।

একশো বছরের পথচলা পূর্ণ করা নিঃসন্দেহে এক মহৎ অর্জন। এই স্বীকৃতির জন্য আপনাদের সকলকে অভিনন্দন জানাই এবং আগামীর জন্য আন্তরিক শুভেচ্ছা রইল।
আমি এখানে পৌঁছে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি এবং হিন্দুস্তান টাইমস-এর শতবর্ষের যাত্রাপথ নিয়ে নির্মিত এক অসাধারণ প্রদর্শনী দেখার সুযোগ পেয়েছি। যদি সময় পান, আমি সকলকেই অনুরোধ করব, অনুষ্ঠান শেষে একবার সেই প্রদর্শনীটি ঘুরে দেখুন। এটি শুধু একটি প্রদর্শনী নয়, এটি এক অনন্য অভিজ্ঞতা। মনে হচ্ছিল, আমার চোখের সামনে যেন শতবর্ষের ইতিহাস ভেসে উঠছে।
আমি দেখলাম, স্বাধীনতার দিন প্রকাশিত পত্রিকা—এবং সেই দিনও, যেদিন আমাদের সংবিধান কার্যকর হয়েছিল। বিশিষ্ট ও প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব যেমন মার্টিন লুথার কিং, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, অটল বিহারী বাজপেয়ী, এবং ড. এম. এস. স্বামীনাথন—তাঁরা সকলেই হিন্দুস্তান টাইমস-এর জন্য লিখতেন। তাঁদের লেখনী এই সংবাদপত্রকে সমৃদ্ধ করেছে অসীমভাবে।

সত্যিই, আমরা এক দীর্ঘ ও গৌরবময় পথ অতিক্রম করেছি—স্বাধীনতার জন্য লড়াই থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পরের অসীম আশার দিনগুলো পর্যন্ত—এই যাত্রা ছিল অনন্য, বিস্ময়কর।
আপনাদের পত্রিকার পাতা উলটে আমি অনুভব করেছি ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে জম্মু ও কাশ্মীরের সংযুক্তিকরণের পর সারা দেশের নাগরিকদের মধ্যে যে উচ্ছ্বাসের ঢেউ উঠেছিল, তারই প্রতিফলন। একই সঙ্গে উপলব্ধি করেছি, কীভাবে সেই সময়ের অনিশ্চয়তা কাশ্মীরকে সাত দশক ধরে অশান্ত রেখেছিল।

আজ, সেই একই পত্রিকার পাতায় আমি দেখি—জম্মু ও কাশ্মীরে রেকর্ড ভোটগ্রহণের খবর। অতীতের সঙ্গে তার এই স্পষ্ট বৈপরীত্য আমাদের ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের প্রতীক।
আরেকটি পৃষ্ঠা বিশেষভাবে দৃষ্টি কেড়েছে—এক পাশে ছাপা হয়েছে অসমকে ‘অশান্ত অঞ্চল’ ঘোষণা করার সংবাদ, আরেক পাশে অটলজীর হাত ধরে ভারতীয় জনতা পার্টির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের খবর। কত সুন্দর এক যোগসূত্র! আজ সেই ভারতীয় জনতা পার্টিই অসমে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করছে।

ঠিক গতকালই আমি বোড়ো অঞ্চলের মানুষদের সঙ্গে এক বড় অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম। আমার বিস্ময় লেগেছিল—দিল্লির মূলধারার গণমাধ্যম এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি প্রায় এড়িয়েই গেল। তারা বুঝতে পারেনি, প্রায় পাঁচ দশক পর আজ সেই বোড়ো তরুণ-তরুণীরা দিল্লির বুকে নিজেদের সাংস্কৃতিক উৎসব উদযাপন করছে—পিছনে ফেলে এসেছে সহিংসতা, বোমা আর বন্দুকের দিনগুলো। এটি নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম, এবং তা হৃদয়ের গভীরে অনুভব করেছি। বোড়ো শান্তি চুক্তি এই মানুষগুলোর জীবনে এক আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে।

প্রদর্শনীতে ঘুরে দেখার সময় আমি ২৬/১১ মুম্বই সন্ত্রাস-হানার প্রতিবেদনগুলিও দেখলাম। তখনকার দিনৃ আমাদের মানুষ নিজেদের ঘরে, নিজেদের শহরেও নিরাপদ বোধ করতেন না—এক প্রতিবেশী দেশের সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের কারণে। কিন্তু আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে—এমনকি সেই দেশেও আজ সন্ত্রাসবাদীরাই নিরাপদ নয়।

বন্ধুগণ,
হিন্দুস্তান টাইমস তার শতবর্ষের অভিযাত্রায় প্রত্যক্ষ করেছে ২৫ বছরের উপনিবেশিক শাসন এবং ৭৫ বছরের স্বাধীনতা। এই ১০০ বছরের পথে যে শক্তি ভারতবর্ষের ভাগ্যগঠনে দিকনির্দেশ দিয়েছে, তা হল ভারতের সাধারণ মানুষের প্রজ্ঞা ও সক্ষমতা। বহু বিশেষজ্ঞই বরাবরই ভারতীয় সাধারণ মানুষের শক্তিকে অবমূল্যায়ন করেছেন। যখন ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে যায়, তখন অনেকেই বলেছিলেন—এই দেশ টিকবে না, ভেঙে পড়বে। জরুরি অবস্থার সময়ও অনেকে ভেবেছিলেন—এটি স্থায়ী হয়ে যাবে, গণতন্ত্র বিলুপ্ত হবে। এমনকি কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানও তখন স্বৈরতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ভারতের নাগরিকেরা উঠে দাঁড়িয়েছিলেন—এবং দেখলেন, বেশি সময় লাগল না, জরুরি অবস্থার অবসান ঘটল।
করোনার কঠিন সময়ের কথাও মনে করুন—তখন বিশ্বজুড়ে ধারণা ছিল, ভারত হয়তো গোটা বিশ্বের উপর বোঝা হয়ে উঠবে। কিন্তু ভারতের মানুষ সেই সংকটের মুখে লড়াই করেছে, দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

বন্ধুগণ,
আপনারা নিশ্চয়ই মনে করতে পারেন ৯০-ওর দশক—যখন মাত্র ১০ বছরে ভারতে পাঁচবার নির্বাচন হয়েছে। এমন এক বৃহৎ দেশে ১০ বছরে পাঁচটি নির্বাচন! এই রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখে বহু বিশ্লেষক ও সংবাদপত্র কলামিস্টরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন—ভারত চিরকাল এমনই অস্থির থাকবে। কিন্তু ভারতের জনগণ আবারও সেই সব বিশেষজ্ঞদের ভুল প্রমাণ করেছেন। আজ যখন বিশ্বের নানা প্রান্তে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে, যখন বহু দেশে প্রতি নির্বাচনে সরকার বদল হচ্ছে, তখন ভারত তৃতীয়বারের মতো একই সরকারকে নির্বাচিত করে স্থিতিশীলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

বন্ধুগণ,
আপনাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ভারতের রাজনীতি ও নীতি-নির্ধারণের পথ অনুসরণ করছেন। একসময় প্রায়ই একটি কথা শোনা যেত—“Good economics is bad politics.” তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের এই ধারণা তখনকার সরকারগুলোর জন্য কিছু না করার এক সহজ অজুহাত হয়ে উঠেছিল। প্রকৃত অর্থে এটি ছিল অদক্ষতা ও দুর্বল শাসনের আড়াল। তখনকার সরকারগুলোর লক্ষ্য ছিল কেবল পরের নির্বাচন জেতা। ভোটব্যাংক তৈরি হতো, আর সেই ভোটব্যাংককে খুশি রাখতেই নীতি নির্ধারিত হতো।
এই ধরনের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছিল দেশের—অসাম্য ও ভারসাম্যহীনতা ভয়াবহভাবে বেড়ে গিয়েছিল। উন্নয়নের কথা ঘোষণায় ছিল, বাস্তবে তা দেখা যেত না। এর ফলে সরকারের প্রতি জনগণের বিশ্বাস ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছিল।

আমরা সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছি—এক সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে, যা ভোটব্যাংক রাজনীতির থেকে বহু দূরের এক পরিসর। আমাদের সরকারের উদ্দেশ্য বৃহৎ ও সর্বব্যাপী—আমরা ‘জনতার উন্নয়ন, জনতার দ্বারা উন্নয়ন এবং জনতার জন্য উন্নয়ন’-এই মন্ত্রে অটল। আমাদের লক্ষ্য—এক নতুন ভারত গঠন, এক বিকসিত ভারত নির্মাণ।

এই মহৎ লক্ষ্য নিয়ে যখন আমরা পথ চলেছি, তখন ভারতের মানুষ আমাদের উপর তাঁদের আস্থার পুঁজি অর্পণ করেছেন। কল্পনা করুন—এই সামাজিক মাধ্যমের যুগে, যখন ভ্রান্ত তথ্য ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুতগতিতে, যখন অসংখ্য সংবাদপত্র ও চ্যানেল রয়েছে—তবুও ভারতের জনগণ আমাদের এবং আমাদের সরকারের উপর তাদের বিশ্বাস অটুট রেখেছেন।

বন্ধুগণ,
যখন মানুষের মধ্যে আস্থা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়, তখন তা জাতির উন্নয়নের উপর এক অনন্য প্রভাব ফেলে। আপনারা জানেন, প্রাচীন উন্নত সভ্যতা থেকে শুরু করে আজকের বিকসিত দেশগুলো পর্যন্ত—একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য সর্বদাই বিদ্যমান থেকেছে, তা হল ঝুঁকি নেওয়ার সংস্কৃতি। এক সময় আমাদের দেশ ছিল বাণিজ্য ও সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ কেন্দ্র। একদিকে আমাদের ব্যবসায়ীরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সক্রিয় ছিলেন, অন্যদিকে তাঁদের গভীর সম্পর্ক ছিল আরব বিশ্ব, আফ্রিকা ও রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গেও। এই বিস্তার সম্ভব হয়েছিল কারণ তাঁরা ঝুঁকি নিতে ভয় পাননি, আর সেই সাহসের ফলেই ভারতের পণ্য ও সেবা পৌঁছে গিয়েছিল দূর-দূরান্তে।
স্বাধীনতার পর আমাদের প্রয়োজন ছিল সেই ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা পুনর্গঠন করা, কিন্তু পূর্ববর্তী সরকারগুলি নাগরিকদের মধ্যে সেই আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে পারেনি। ফলে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম এক পা এগিয়ে দুই পা পিছিয়ে চলেছে। গত এক দশকে দেশের পরিবর্তনের ধারায় এই ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা আবারও নবজীবন পেয়েছে। আজকের ভারতের তরুণ সমাজ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাহসিকতার সঙ্গে ঝুঁকি নিচ্ছে।
কখনও একটি কোম্পানি শুরু করাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হতো—দশ বছর আগেও স্টার্ট-আপের গল্পগুলো বিরল ছিল। আজ দেশে ১ লক্ষ ২৫ হাজারেরও বেশি নিবন্ধিত স্টার্ট-আপ রয়েছে। একসময় খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে নেওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হতো। কিন্তু আজ ভারতের ছোট শহরের তরুণ-তরুণীরাও সেই ঝুঁকি নিচ্ছে এবং দেশের নাম উজ্জ্বল করছে।

স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত নারীরাও এর আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ। আজ প্রায় এক কোটি নারী ‘লক্ষ্মী-দিদি’ হয়ে উঠেছেন—নিজেদের ব্যবসা চালাচ্ছেন, উদ্যোক্তা হিসেবে গ্রামীণ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি আমি এক গ্রামীণ নারীর সঙ্গে কথা বলেছিলাম—তিনি জানিয়েছিলেন, কীভাবে তিনি একটি ট্র্যাক্টর কিনে পরিবারের আয় বহুগুণ বাড়িয়েছেন। এক নারীর সেই সাহস তাঁর গোটা পরিবারের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। যখন দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষ ঝুঁকি নিতে শেখে, তখনই প্রকৃত পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়। আজকের ভারতে আমরা সেটিই প্রত্যক্ষ করছি।

বন্ধুগণ,
আজ ভারতের সমাজ অভূতপূর্ব আকাঙ্ক্ষায় ভরপুর, এবং আমরা সেই আকাঙ্ক্ষাকেই আমাদের নীতি-নির্ধারণের ভিত্তি করেছি। আমাদের সরকার নাগরিকদের জন্য এমন এক অনন্য বিনিয়োগ-সমন্বয় গড়ে তুলেছে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং মর্যাদা নিশ্চিত করে। আমরা এমন এক উন্নয়ন মডেল গড়ে তুলছি, যা বিনিয়োগ বাড়ায়, কর্মসংস্থান তৈরি করে, এবং নাগরিকদের সম্মান বৃদ্ধি করে।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক—দেশে শৌচাগার নির্মাণের উদ্যোগ। আমি এমন একটি বিষয়ের কথা বলছি, যা আপাতদৃষ্টিতে ক্ষুদ্র মনে হলেও এর প্রভাব গভীর। আমাদের শৌচাগার নির্মাণ মিশন কেবল একটি সুবিধা প্রদানের প্রকল্প ছিল না—এটি ছিল কোটি কোটি মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার এক আন্দোলন।
অনেকে বলেন—কোটি কোটি শৌচাগার তৈরি হয়েছে। সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু প্রতিটি শৌচাগারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইট, লোহা, সিমেন্ট—যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। এগুলো কোনো দোকান থেকে এসেছে, কোনো শিল্পে উৎপাদিত হয়েছে, কোনো পরিবহনকারী তা মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। অর্থাৎ, অর্থনীতিও চাঙ্গা হয়েছে, বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। এর ফলে মানুষের জীবন সহজ হয়েছে, আত্মসম্মান বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং উন্নয়নের পথ প্রশস্ত হয়েছে।
এটাই প্রমাণ করে সেই মন্ত্রের সাফল্য—
 “বিনিয়োগ থেকে কর্মসংস্থান, উন্নয়ন থেকে মর্যাদা।”

বন্ধুগণ,
আরেকটি উদাহরণ—এলপিজি গ্যাস সংযোগ। এক সময় ঘরে গ্যাস সিলিন্ডার থাকা মানে ছিল সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। প্রতিবেশীরা এমন মানুষকে প্রভাবশালী ভাবতেন, কারণ তাঁর ঘরে গ্যাস চুলা ছিল। যাঁদের গ্যাস সংযোগ ছিল না, তাঁরা সেই দিনের অপেক্ষায় থাকতেন যখন তাঁরাও গ্যাস চুলায় রান্না করতে পারবেন। এমনও সময় ছিল, যখন গ্যাস সংযোগ পেতে সাংসদদের সুপারিশপত্র নিতে হতো।
আমি ১৮শ শতাব্দীর কথা বলছি না, বলছি ২১শ শতাব্দীর শুরু দিকের কথা। ২০১৪ সালের আগে সরকারগুলি আলোচনা করত—ছ’টি না নয়টি সিলিন্ডার দেওয়া হবে বছরে! আমরা সেই বিতর্ককে সরিয়ে দিয়েছি, আর লক্ষ্য স্থির করেছি—প্রত্যেক পরিবারে গ্যাস সংযোগ পৌঁছে দিতে হবে।
স্বাধীনতার পর ৭০ বছরে যত গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছিল, তার চেয়েও বেশি সংযোগ গত ১০ বছরে দেওয়া হয়েছে। ২০১৪ সালে দেশে ১৪ কোটি গ্যাস সংযোগ ছিল—আজ তা ৩০ কোটিরও বেশি। এত বিপুল সংখ্যক নতুন ভোক্তা যোগ হওয়ার পরও, কখনও কি গ্যাসের ঘাটতির খবর শুনেছেন? কখনও হিন্দুস্তান টাইমস-এ এমন সংবাদ দেখেছেন? না, কারণ তা ঘটেনি।
এটি সম্ভব হয়েছে কারণ আমরা প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তুলেছি—দেশজুড়ে বটলিং প্লান্ট, বিতরণ কেন্দ্র তৈরি করেছি। এর ফলে কর্মসংস্থান বেড়েছে—বটলিং প্লান্ট থেকে শুরু করে সিলিন্ডার বিতরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে।

বন্ধুগণ,
এ রকম অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যায়। যেমন মোবাইল ফোন বা রূপে কার্ডের কথা ধরুন। একসময় ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড থাকাটা এক বিশেষ গর্বের বিষয় ছিল। দরিদ্র মানুষ তখন সেই কার্ড দেখেই ভাবতেন—“আমারও যদি এমন একদিন হতো!” কিন্তু রূপে কার্ড আসার পর আজ দেশের দরিদ্রতম মানুষও নিজের ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড রাখছেন। এতে তাঁদের আত্মসম্মান বেড়েছে, তাঁরা সমান মর্যাদার অনুভূতি পাচ্ছেন।
আজ বিলাসবহুল গাড়ি থেকে নেমে কেউ যদি শপিং মলে কেনাকাটা করেন, আর এক রাস্তার দোকানদার—দুজনেই একই ইউপিআই পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার করছেন। এটাই প্রমাণ—কিভাবে বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং উন্নয়ন মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি করে।

বন্ধুগণ,
ভারতের বর্তমান উন্নয়নের ধারা বুঝতে হলে আমাদের সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা প্রয়োজন। আমাদের দুটি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে—একটি হলো ‘জনগণের জন্য বৃহৎ ব্যয়’, আর অন্যটি হলো ‘জনগণের জন্য বৃহৎ সঞ্চয়’।
২০১৪ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় বাজেট ছিল প্রায় ১৬ লক্ষ কোটি টাকা। আজ তা বেড়ে হয়েছে ৪৮ লক্ষ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে পুঁজিনিবেশে ব্যয় ছিল প্রায় ২.২৫ লক্ষ কোটি টাকা, আজ তা ১১ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই ১১ লক্ষ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে নতুন হাসপাতাল, বিদ্যালয়, সড়ক, রেলপথ, গবেষণা কেন্দ্র এবং বিভিন্ন জনউপযোগী পরিকাঠামো তৈরিতে।
আমরা যেমন জনগণের জন্য ব্যয় বাড়িয়েছি, তেমনি জনগণের অর্থও সঞ্চয় করছি। কিছু পরিসংখ্যান শেয়ার করতে চাই ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (DBT)-এর মাধ্যমে ফাঁস রোধ করে দেশ বাঁচিয়েছে ৩.৫ লক্ষ কোটি টাকা। আয়ুষ্মান ভারত কর্মসূচির ফলে গরিব মানুষ ১.১ লক্ষ কোটি টাকার বিনামূল্যে চিকিৎসা সুবিধা পেয়েছেন। জনঔষধি কেন্দ্রের মাধ্যমে নাগরিকরা ৮০% ছাড়ে ওষুধ পেয়ে ৩০,০০০ কোটি টাকা সাশ্রয় করেছেন। স্টেন্ট ও হাঁটু ইমপ্ল্যান্টের মূল্যনিয়ন্ত্রণে মানুষ বাঁচিয়েছেন হাজার হাজার কোটি টাকা। উজালা স্কিমে এলইডি বাল্ব ব্যবহারের ফলে বিদ্যুৎ বিল কমেছে ২০,০০০ কোটি টাকা। স্বচ্ছ ভারত মিশন অসুস্থতা হ্রাস করে প্রত্যেক গ্রামীণ পরিবারকে বাঁচিয়েছে প্রায় ৫০,০০০ টাকা। ইউনিসেফ জানিয়েছে—যেসব পরিবারের নিজস্ব শৌচাগার আছে, তারা বছরে প্রায় ৭০,০০০ টাকা সাশ্রয় করছে।

বন্ধুগণ,
যেসব ১২ কোটি পরিবার প্রথমবারের মতো কলের জল পেয়েছে, তাদের নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) এক সমীক্ষায় দেখা গেছে—এই পরিবারগুলি বছরে গড়ে ৮০,০০০ টাকারও বেশি সাশ্রয় করছে, কারণ তারা এখন বিশুদ্ধ পানীয় জলের নাগাল পাচ্ছে।

বন্ধুগণ,
দশ বছর আগে কেউ কল্পনাও করতে পারেনি, ভারত এতটা রূপান্তরিত হতে পারে। আমাদের সাফল্য আজ আমাদের আরও বড় স্বপ্ন দেখার সাহস জুগিয়েছে এবং সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য আরও কঠোর পরিশ্রমের প্রেরণা দিয়েছে। আজ দেশের ভেতর এক নবীন আশাবাদ, এক দৃঢ় বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে—এই শতাব্দী হবে ভারতের শতাব্দী। কিন্তু এই বিশ্বাসকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদের বহু ক্ষেত্রে কাজের গতি আরও বাড়াতে হবে। আমরা সেই পথে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছি। আমাদের প্রত্যেক ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মান অর্জনের দিকে এগোতে হবে। এমন মানসিকতা তৈরি করতে হবে যে, আমাদের কাছে শ্রেষ্ঠত্বের চেয়ে কম কিছুই গ্রহণযোগ্য নয়।
আমাদের এমন প্রক্রিয়া তৈরি করতে হবে যাতে ভারতের মানদণ্ড বিশ্বমান হিসেবে স্বীকৃত হয়। আমাদের উৎপাদিত পণ্য হতে হবে এমন, যা বিশ্বের বাজারে উৎকর্ষের প্রতীক হিসেবে পরিচিত হবে। আমাদের পরিকাঠামো নির্মাণ হবে বিশ্বমানের উদাহরণ। শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের উদ্যোগ ও গবেষণা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে। বিনোদন শিল্পেও আমাদের সৃষ্টিকর্ম হবে বিশ্বজোড়া প্রশংসার দাবিদার। এই দৃষ্টিভঙ্গি রক্ষা ও প্রসারে হিন্দুস্তান টাইমস-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনারা যে ১০০ বছরের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন, তা হবে ‘বিকসিত ভারত’-এর অভিযাত্রায় এক অমূল্য সম্পদ।

বন্ধুগণ,
আমি সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী যে, এই উন্নয়নের গতি আমরা বজায় রাখব এবং খুব শীঘ্রই ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে। যখন ভারত তার স্বাধীনতার ১০০ বছর উদযাপন করবে, তখন হিন্দুস্তান টাইমস প্রায় ১২৫ বছরে পা রাখবে—আর তখন সেটি হবে ‘বিকশিত ভারত’-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবাদপত্র। আপনারা হবেন এই ঐতিহাসিক যাত্রার সাক্ষী।
তবে যেহেতু আমি আজ এখানে উপস্থিত, তাই (শোভনা) ভারতিয়া জিকে একটি দায়িত্ব অর্পণ করতে চাই।
আমাদের মহান সাহিত্য ব্যক্তিত্বদের রচনাকে ঘিরে গবেষণা হয়েছে, বহু ক্ষেত্রে পিএইচডি সম্পন্ন হয়েছে। তাহলে হিন্দুস্তান টাইমস-এর শতবর্ষের যাত্রা নিয়ে কেন একটি পিএইচডি গবেষণা হবে না? এটি হবে ভারতীয় সাংবাদিকতার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ নথি—যেখানে দেখা যাবে উপনিবেশিক যুগ থেকে স্বাধীনোত্তর কাল পর্যন্ত, দারিদ্র্যের দিন থেকে প্রভাবশালী সময় পর্যন্ত এক দীর্ঘ অভিযাত্রা। আমি মনে করি, এটি হবে এক অসামান্য অবদান।
বিরলা পরিবার মানবকল্যাণে দানের ঐতিহ্যের জন্য সুপরিচিত। তাহলে কেন না একটি হিন্দুস্তান টাইমস চেয়ার প্রতিষ্ঠা করা হয় ভারতের এবং বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে—যা ভারতকে বিশ্বের প্রেক্ষাপটে তার সত্যিকারের পরিচয়ে তুলে ধরতে গবেষণায় নিবেদিত থাকবে?
আপনাদের পত্রিকা ইতিমধ্যেই বহু মহান কাজ করেছে, কিন্তু বিগত শতকে যে সম্মান ও আস্থা অর্জিত হয়েছে, তা শুধু হিন্দুস্তান টাইমস-এর সীমায় সীমাবদ্ধ নয়—তা উত্তর প্রজন্মেরও প্রেরণা হয়ে থাকবে। আমি নিশ্চিত, এই শতবর্ষ সেমিনার এখানেই শেষ হবে না—বরং নতুন উদ্যোগের সূচনা ঘটাবে।
দ্বিতীয়ত, আমি যে প্রদর্শনীটি দেখেছি, তা সত্যিই অসাধারণ। যদি তার একটি ডিজিটাল সংস্করণ তৈরি করে বিশদ ব্যাখ্যাসহ দেশের প্রতিটি স্কুল শিক্ষার্থীর জন্য সহজলভ্য করা যায়, তাহলে তারা ভারতের ইতিহাস, সংগ্রাম ও অগ্রগতির এক অমূল্য পাঠ লাভ করবে। আমি জানি, আপনারা এই প্রদর্শনীতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন—একটি ডিজিটাল রূপ দিলে এটি সমগ্র দেশের শিশুদের জন্য আকর্ষণ ও শিক্ষার এক মহামূল্যবান মাধ্যম হবে।

বন্ধুগণ,
একশো বছর একটি বিশাল মাইলফলক। এই দিনগুলিতে আমি নানা কাজে যথেষ্ট ব্যস্ত থাকি, তবুও আজকের এই অনুষ্ঠানে নিজে উপস্থিত থাকতে চেয়েছি, কারণ শতবর্ষ পূর্ণ করা নিজেই এক অসামান্য কৃতিত্ব। তাই আপনাদের এবং আপনাদের সমগ্র দলকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।
আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ!

 

*****

SSS/TM


(রিলিজ আইডি: 2177655) ভিজিটরের কাউন্টার : 29