প্রকাশিত:
28 OCT 2026 12:19PM by PIB Kolkata
২৮ অক্টোবর, ২০২৬
ভারতের মহাকাশ যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৬৩ সালে, কেরলের থুম্বা থেকে একটি সাউন্ডিং রকেট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে। বর্তমানে দেশ পরিকল্পিত ভারতীয় অন্তরীক্ষ স্টেশনের দিকে এগিয়ে চলেছে। নতুন প্রযুক্তি এই অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করছে। এর মধ্যে রয়েছে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎক্ষেপণ যান, বৈদ্যুতিক, পরিবেশবান্ধব ও পারমাণবিক প্রপালশন প্রযুক্তি এবং কক্ষপথে পরিষেবা প্রদান। স্প্যাডেক্স (SpaDeX)-এর মাধ্যমে ভারত কক্ষপথে দুটি মহাকাশযানের স্বয়ংক্রিয় ডকিং-এ সাফল্য অর্জনকারী বিশ্বের চতুর্থ দেশ হয়ে উঠেছে। এই অগ্রগতিগুলি আত্মনির্ভরতা আরও শক্তিশালী করছে।
অন্যদিকে, গগনযান ভারতীয় মানব মহাকাশযাত্রার লক্ষ্য পূরণের পথে অগ্রগতি ঘটাচ্ছে।
মহাকাশ বিজ্ঞান ও বর্তমান সময়ে এর প্রাসঙ্গিকতা
ড. বিক্রম এ. সারাভাইয়ের দূরদর্শী ভাবনায় ১৯৬২ সালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কমিটি ফর স্পেস রিসার্চ (INCOSPAR) গঠনের মধ্য দিয়ে ভারতে সুসংগঠিত মহাকাশ কার্যক্রমের সূচনা হয়। ১৯৬৩ সালের ২১ নভেম্বর কেরলের থুম্বা থেকে প্রথম সাউন্ডিং রকেট উৎক্ষেপণ করা হয়। ১৯৬৯ সালের ১৫ আগস্ট ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন (ISRO) গঠিত হয় এবং এটি INCOSPAR-এর স্থলাভিষিক্ত হয়।
পরবর্তীকালে, ১৯৭২ সালে সংস্থাটিকে মহাকাশ দপ্তরের অধীনে আনা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ISRO উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দর্শন অনুসরণ করে এসেছে- অর্থাৎ, পৃথিবীর বুকে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য মহাকাশ প্রযুক্তির ব্যবহার। কয়েক দশকে সংস্থাটি শুধু উৎক্ষেপণ পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এই সুনামের ভিত্তি এখন একটি সহজ অঙ্গীকার: প্রতিটি মহাকাশ অভিযান সাধারণ নাগরিকের কাজে আসতে হবে।
এই দূরদর্শী ভাবনা এখন দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে। যোগাযোগ উপগ্রহ প্রত্যন্ত ও পর্যাপ্ত পরিষেবা না-পাওয়া এলাকায় সংযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারিত করছে। পৃথিবী পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত তথ্য কৃষিকাজ, দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন, পরিকল্পনা, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং অন্যান্য জাতীয় প্রয়োজন পূরণে সহায়তা করছে। আবহাওয়া উপগ্রহ ঘূর্ণিঝড় ও মৌসুমি বায়ুর গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে এবং আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার মাধ্যমে মানুষের জীবন রক্ষা করতে সাহায্য করে। মৎস্যজীবী, কৃষক ও উপকূলবর্তী এলাকার মানুষ তাঁদের জীবিকা সুরক্ষিত রাখতে এই সতর্কবার্তার ওপর নির্ভর করেন। এই ব্যবস্থাগুলি নাগরিকদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে, জনসমাজকে সুরক্ষা দেয়, প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সুস্থায়ী উন্নয়নে গতি আনে।
এই পরিষেবাগুলির পাশাপাশি, মহাকাশ প্রযুক্তি ভারতের সীমান্ত সুরক্ষায় সহায়তা করে এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মহাকাশভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রয়োজন পূরণে সহায়তা করে।
এই শক্তিশালী ভিত্তির ওপর নির্ভর করে উদীয়মান প্রযুক্তিগুলি উদ্ভাবন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে। বেসরকারি সংস্থা ও স্টার্ট-আপগুলিও এখন এই যাত্রায় অংশ নিচ্ছে। এর ফলে ভারত আত্মবিশ্বাসী, আত্মনির্ভর এবং বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত মহাকাশ শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করছে।
সৃজনশীল মন, বিজ্ঞানের অনুঘটক, প্রযুক্তির ক্ষমতায়ন
ভারতের উদীয়মান বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন সম্মেলনের (ESTIC) দ্বিতীয় সংস্করণ হল ESTIC-2026। এই সম্মেলন ২০২৬ সালের ২৭ থেকে ২৯ অক্টোবর নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। মহাকাশ দপ্তর/ইসরো (ISRO) আয়োজিত মহাকাশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক অধিবেশনটি ২০২৬ সালের ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে এবং এটি সম্মেলনের অন্যতম বিষয়ভিত্তিক কর্মসূচি।
উদীয়মান মহাকাশ প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ভারত যখন আরও বেশি আত্মনির্ভরতা এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যপূরণের দিকে এগিয়ে চলেছে, তখন এই যাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি গড়ে উঠছে। এই উদ্ভাবনগুলির মধ্যে রয়েছে পরবর্তী প্রজন্মের উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, মহাকাশে বিভিন্ন কার্যক্রম, মানব মহাকাশযাত্রা এবং উন্নত নেভিগেশন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। এগুলি ভারতের প্রাথমিক সাফল্য থেকে ভবিষ্যতের উপযোগী মহাকাশ কর্মসূচির দিকে অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়।
আগামী কয়েক দশকের কথা মাথায় রেখে গড়ে ওঠা এই কর্মসূচিগুলির লক্ষ্য হল ভারতকে প্রতিযোগিতায় সক্ষম, সংযুক্ত এবং দৃঢ়ভাবে আত্মনির্ভর হিসেবে তৈরি রাখা।
পরবর্তী প্রজন্মের উৎক্ষেপণ যান (NGLV)
মহাকাশে পৌঁছানোর যাত্রা শুরু হয় উৎক্ষেপণের সক্ষমতা দিয়ে। যে দেশ নিজস্ব রকেট তৈরি ও উৎক্ষেপণ করতে পারে, সেই দেশই নির্ধারণ করতে পারে কখন, কিভাবে এবং কত খরচে মহাকাশে পৌঁছানো যাবে। ভারতের উৎক্ষেপণ কর্মসূচি ছোট, একবার ব্যবহারযোগ্য রকেট থেকে ভারী পেলোড বহনে সক্ষম উৎক্ষেপণ যানের দিকে এগিয়েছে। বর্তমানে দেশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে এগোচ্ছে।
ভারতের প্রচলিত উৎক্ষেপণ যান
- পিএসএলভি (পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল): ইসরোর অন্যতম নির্ভরযোগ্য উৎক্ষেপণ যান পিএসএলভি (PSLV)। অভিযানের বিন্যাস অনুযায়ী, এটি ৬০০ কিলোমিটার উচ্চতায় সূর্য-সমলয় মেরু কক্ষপথে (SSPO) সর্বোচ্চ ১,৭৫০ কেজি এবং সাব-জিওসিঙ্ক্রোনাস ট্রান্সফার অরবিটে (Sub-GTO) সর্বোচ্চ ১,৪২৫ কেজি পেলোড বহন করতে পারে।
- জিএসএলভি (জিওসিঙ্ক্রোনাস স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল): এই উৎক্ষেপণ যানে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ক্রায়োজেনিক আপার স্টেজ ব্যবহার করা হয়। এটি ২ টন শ্রেণীর যোগাযোগ উপগ্রহ বহন করতে পারে।
- এলভিএম৩ (লঞ্চ ভেহিকল মার্ক-৩) ভারতের ভারী পেলোড বহনে সক্ষম উৎক্ষেপণ যান। এটি ৪ টন শ্রেণীর যোগাযোগ উপগ্রহ জিওসিঙ্ক্রোনাস ট্রান্সফার অরবিটে (GTO) এবং ১০ টন শ্রেণীর পেলোড লো আর্থ অরবিটে (LEO) নিয়ে যেতে পারে।
- এসএসএলভি (স্মল স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল): এসএসএলভি একটি তিন-স্তরবিশিষ্ট উৎক্ষেপণ যান, যার উৎক্ষেপণের সময় ওজন প্রায় ১২০ টন। এটি প্রায় ৫০০ কেজি শ্রেণীর উপগ্রহকে ৫০০ কিলোমিটার উচ্চতার সমতল কক্ষপথে স্থাপন করতে পারে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা পরবর্তী প্রজন্মের উৎক্ষেপণ যান (NGLV)-এর উন্নয়নের অনুমোদন দেয়। অনুমোদিত ৮,২৪০ কোটি টাকার বরাদ্দের মধ্যে উন্নয়ন ব্যয়, তিনটি উন্নয়নমূলক পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ, প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো, কর্মসূচি পরিচালনা এবং উৎক্ষেপণ সংক্রান্ত কার্যক্রমের ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। লো আর্থ অরবিটে (LEO) সর্বোচ্চ ৩০ টন পেলোড বহনের ক্ষমতাসম্পন্ন NGLV-এর নকশা করা হয়েছে। LVM3-এর LEO-তে ১০ টন পেলোড বহনের সীমার তুলনায় NGLV ভারতের বর্তমান উৎক্ষেপণ সক্ষমতা তিন গুণ বাড়াবে। পাশাপাশি, মহাকাশে পৌঁছানোর খরচ কমাতে LEO-তে ১৪ টন পেলোড বহনে সক্ষম NGLV-এর একটি আংশিক পুনর্ব্যবহারযোগ্য সংস্করণ তৈরি করা হচ্ছে। এর পুনর্ব্যবহারযোগ্য বৈশিষ্ট্য মহাকাশে পৌঁছানোর খরচও কমাবে।
NGLV দেশের জাতীয় ও বাণিজ্যিক—উভয় ধরনের মহাকাশ অভিযান পরিচালনায় সক্ষমতা জোগাবে। এর মধ্যে রয়েছে ভারতীয় অন্তরীক্ষ স্টেশনে মানব মহাকাশযাত্রা এবং চন্দ্র ও আন্তঃগ্রহ অনুসন্ধান। এছাড়াও, এই উৎক্ষেপণ যান লো আর্থ অরবিটে যোগাযোগ ও পৃথিবী পর্যবেক্ষণ উপগ্রহের সমষ্টি স্থাপন করবে। এই অভিযানগুলি সমগ্র মহাকাশ ক্ষেত্রের জন্য উপকারী হবে এবং দেশের সক্ষমতা ও সামর্থ্য বৃদ্ধি করবে।
গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা সম্পর্কে ধারণা
সূর্য-সমলয় কক্ষপথ (SSO): সূর্য-সমলয় কক্ষপথ হল মেরু অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থিত এমন একটি কক্ষপথ, যেখানে একটি উপগ্রহ কোনও নির্দিষ্ট এলাকার ওপর দিয়ে প্রায় একই স্থানীয় সৌর সময়ে অতিক্রম করে। এর ফলে, প্রায় একই আলোক পরিস্থিতিতে সংগৃহীত তথ্যের তুলনা করা সম্ভব হয়। কোনও নির্দিষ্ট স্থানের পুনরায় পর্যবেক্ষণের মধ্যবর্তী সময় উপগ্রহ এবং তার কক্ষপথের ওপর নির্ভর করে।
জিওস্টেশনারি ট্রান্সফার অরবিট (GTO): GTO হল একটি উপবৃত্তাকার মধ্যবর্তী কক্ষপথ, যা কোনও উপগ্রহকে জিওস্টেশনারি কক্ষপথে (GEO) স্থানান্তরিত করতে ব্যবহৃত হয়। এই কক্ষপথের সর্বনিম্ন বিন্দু (পেরিজি) সাধারণত পৃথিবীর কয়েকশো কিলোমিটার ওপরে থাকে, আর সর্বোচ্চ বিন্দু (অ্যাপোজি) পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৫,৭৮৬ কিলোমিটার উচ্চতায় অবস্থিত। উৎক্ষেপণ যান সাধারণত উপগ্রহকে সরাসরি GEO-তে না পাঠিয়ে GTO-তে স্থাপন করে। অ্যাপোজির কাছাকাছি পৌঁছে উপগ্রহটি তার নিজস্ব অ্যাপোজি মোটর চালু করে পেরিজির উচ্চতা বাড়ায় এবং কক্ষপথকে বৃত্তাকার করে। পৃথিবীর নিরক্ষীয় তলের সঙ্গে কক্ষপথের সামঞ্জস্য বিধানের জন্য অতিরিক্ত কৌশলগত পদক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে। GEO-তে উপগ্রহটি নিরক্ষরেখার ওপর দিয়ে পৃথিবীর আবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সময়কালে প্রদক্ষিণ করে। ফলে, পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে সেটিকে স্থির অবস্থানে রয়েছে বলে মনে হয়।
ক্রায়োজেনিক আপার স্টেজ: ক্রায়োজেনিক আপার স্টেজ হল উৎক্ষেপণ যানের শেষ স্তর, যেখানে নির্দিষ্ট কক্ষপথে উপগ্রহ স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চ দক্ষতা অর্জনে ক্রায়োজেনিক জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। GSLV-তে ব্যবহৃত ইসরোর দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ক্রায়োজেনিক আপার স্টেজে জ্বালানি হিসেবে তরল হাইড্রোজেন (LH₂) এবং জারক হিসেবে তরল অক্সিজেন (LOX) ব্যবহার করা হয়। এই দুটি উপাদানই অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়।
GSLV-এর আগের উৎক্ষেপণগুলিতে ব্যবহৃত রাশিয়া-সরবরাহ করা স্টেজের পরিবর্তে এই দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে। এর ফলে উন্নত উৎক্ষেপণ যান প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ভারতের আত্মনির্ভরতা আরও শক্তিশালী হয়েছে।
পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎক্ষেপণ যান (RLV)
RLV প্রযুক্তি উৎক্ষেপণের খরচ কমাতে এবং কার্যক্রমের দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। প্রচলিত একবার ব্যবহারযোগ্য উৎক্ষেপণ যানের বিপরীতে, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে পরবর্তী অভিযানে ব্যবহারের জন্য এর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি পুনরুদ্ধার করা যায়। এই প্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য বায়ুমণ্ডলে নিয়ন্ত্রিত পুনঃপ্রবেশ, স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন, বায়ুগতিবিদ্যাভিত্তিক উড্ডয়ন এবং নির্ভুল অবতরণ প্রয়োজন। ইসরো তার ডানাযুক্ত পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎক্ষেপণ যান প্রযুক্তি প্রদর্শক ‘পুষ্পক’-এর মাধ্যমে রানওয়েতে স্বয়ংক্রিয় অবতরণ প্রযুক্তি প্রদর্শন করেছে। RLV-এর তিনটি অবতরণ পরীক্ষা যথাক্রমে ২০২৩ সালের ২ এপ্রিল, ২০২৪ সালের ২২ মার্চ এবং ২০২৪ সালের ২৩ জুন সম্পন্ন হয়। LEX-03 আরও কঠিন ক্রস-রেঞ্জ ও বায়ুপ্রবাহের পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয় অবতরণের সক্ষমতা যাচাই করেছে।
স্ক্র্যামজেট প্রযুক্তি: ভারতের পুনর্ব্যবহারযোগ্য মহাকাশ পরিবহণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা
স্ক্র্যামজেট (সুপারসনিক কমবাসশন র্যামজেট) হল বায়ু-নির্ভর একটি জেট ইঞ্জিন। এতে শুধু জ্বালানি বহন করা হয় এবং জারণের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পারিপার্শ্বিক বায়ু থেকে নেওয়া হয়। প্রচলিত রকেটে জ্বালানি ও জারক- উভয়ই বহন করতে হয়। ফলে, স্ক্র্যামজেট তুলনামূলকভাবে হালকা হয় এবং একই উৎক্ষেপণকালীন ভরের ক্ষেত্রে বেশি পেলোড বহন করতে পারে। এটি কেবল বায়ুমণ্ডলের মধ্যে অত্যন্ত উচ্চ গতিতে কাজ করে। তাই প্রথমে একটি বুস্টারের সাহায্যে এর গতি বাড়াতে হয়। এর গতি ম্যাক সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা হয়। ম্যাক ১ শব্দের গতির সমান। ম্যাক ৫-এর বেশি গতিকে হাইপারসনিক বলা হয়। পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎক্ষেপণ যানের সঙ্গে স্ক্র্যামজেট প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎক্ষেপণ যান খরচ কমাতে এর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি পুনরুদ্ধার করে আবার ব্যবহার করে। স্ক্র্যামজেট প্রযুক্তি কম খরচে মহাকাশে পৌঁছানোর একটি সম্ভাবনাময় পথ তৈরি করে। ভারত ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট তার স্ক্র্যামজেটের উড্ডয়ন পরীক্ষা চালায়। এটি ম্যাক ৬ গতিতে পৌঁছেছিল, যা হাইপারসনিক গতি। এর মাধ্যমে এই প্রযুক্তি প্রদর্শনকারী বিশ্বের চতুর্থ দেশ হয়ে ওঠে ভারত। ২০২৪ সালের ২২ জুলাই ইসরো পৃথকভাবে একটি পরীক্ষামূলক RH-560 সাউন্ডিং রকেটের উড্ডয়ন পরিচালনা করে, যার উদ্দেশ্য ছিল বায়ু-নির্ভর প্রপালশন ব্যবস্থা প্রদর্শন করা এবং তার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা।
দেশীয় মহাকাশ সরঞ্জাম ও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি
প্রতিটি মহাকাশ অভিযান ইঞ্জিন, থ্রাস্টার, জ্বালানি এবং শক্তি ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। ভারতের অভ্যন্তরেই এই প্রযুক্তিগুলির উন্নয়ন বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করে এবং স্বাধীনভাবে মহাকাশযান তৈরি ও পরিচালনার ক্ষেত্রে দেশের সক্ষমতা বাড়ায়। ইসরো বৈদ্যুতিক প্রপালশন ও বিকল্প জ্বালানিসহ দেশীয় প্রপালশন প্রযুক্তির উন্নয়নে কাজ করছে। পাশাপাশি, ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের জন্য বিভিন্ন প্রযুক্তি নিয়েও গবেষণা চালাচ্ছে। এই প্রচেষ্টাগুলি মহাকাশ ক্ষেত্রে ভারতের দীর্ঘমেয়াদী আত্মনির্ভরতার লক্ষ্য পূরণে সহায়তা করছে।
অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হল বৈদ্যুতিক প্রপালশন, যেখানে বৈদ্যুতিক শক্তি ব্যবহার করে প্রপেল্যান্টের গতি বাড়ানো হয় এবং থ্রাস্ট বা চালিকাশক্তি উৎপন্ন করা হয়। প্রচলিত রাসায়নিক প্রপালশনের তুলনায় এই প্রযুক্তির সাহায্যে অনেক কম প্রপেল্যান্ট ব্যবহার করে একই ধরনের কক্ষপথ পরিবর্তন করা সম্ভব। এর ফলে, উপগ্রহে বহন করতে হয় এমন জ্বালানির পরিমাণ কমে এবং যোগাযোগ সরঞ্জাম ও অন্যান্য পেলোডের জন্য অতিরিক্ত স্থান ও ভরসীমা পাওয়া যায়।
২০২৫ সালের ২৭ মার্চ ইসরো তার দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ৩০০ মিলিনিউটন (mN) স্টেশনারি প্লাজমা থ্রাস্টারের ১,০০০ ঘণ্টার কার্যকাল পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করে। এর স্পেসিফিক ইমপালস বা প্রপালশনের দক্ষতা পরিমাপক মান প্রচলিত প্রপালশন ব্যবস্থার তুলনায় অন্তত ছয় গুণ। ইসরো তার টেকনোলজি ডেমনস্ট্রেশন স্যাটেলাইট (TDS-01)-এর মাধ্যমে এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করার পরিকল্পনা করেছে। ভবিষ্যতের বৈদ্যুতিক প্রপালশনযুক্ত উপগ্রহে কক্ষপথের উচ্চতা বাড়ানো এবং নির্দিষ্ট কক্ষপথে অবস্থান বজায় রাখার মতো কাজে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
বৈদ্যুতিক প্রপালশনের পাশাপাশি, পরিবেশের ওপর প্রভাব কমানো এবং প্রপালশনের দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ইসরো বিকল্প প্রপেল্যান্ট তৈরি করছে। এই উদ্যোগকে গ্রিন প্রপালশন বলা হয়। এর একটি উদাহরণ হল ISROSENE, যা রকেটের জন্য বিশেষভাবে তৈরি কেরোসিন।
সেমি-ক্রায়োজেনিক রকেট ইঞ্জিনে ব্যবহারের জন্য তরল অক্সিজেন ও কেরোসিনভিত্তিক প্রপেল্যান্ট তৈরি করা হচ্ছে।
গ্রিন প্রপালশনের অগ্রগতি ইসরোর নিজস্ব উন্নয়ন কর্মসূচির বাইরেও বিস্তৃত। প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার (DRDO) টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট ফান্ড-এর অধীনে বেঙ্গালুরুভিত্তিক বেলাট্রিক্স অ্যারোস্পেস মাইক্রোস্যাটেলাইটের অভিমুখ নিয়ন্ত্রণ ও কক্ষপথে অবস্থান বজায় রাখার জন্য ১ নিউটন-শ্রেণীর গ্রীন মনোপ্রপেল্যান্ট থ্রাস্টার তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে PSLV-C58-এর মাধ্যমে উৎক্ষেপিত একটি পেলোডে এই প্রযুক্তির কক্ষপথে কার্যকারিতা প্রদর্শন করা হয়।
এই উন্নয়নগুলি দেশীয় বৈদ্যুতিক ও গ্রীন প্রপালশন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ভারতের অগ্রগতিকে তুলে ধরে। ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানে এই প্রযুক্তিগুলির আরও ব্যাপক ব্যবহারের উপযোগিতা নির্ধারণে ধারাবাহিক পরীক্ষা ও কার্যকারিতা যাচাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
তেজস্ক্রিয় সমস্থানিকভিত্তিক তাপ ও বিদ্যুৎ প্রযুক্তি
ইসরো (ISRO) এবং পরমাণু শক্তি দপ্তর (DAE) তাপ সরবরাহকারী রেডিওআইসোটোপ হিটার ইউনিট (RHU) এবং রেডিওআইসোটোপের তাপকে বৈদ্যুতিক শক্তিতে রূপান্তরকারী রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটর (RTG)-এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যৌথভাবে কাজ করছে। ভবিষ্যতে সম্ভাব্য চন্দ্রযান ও মঙ্গল অভিযানগুলির জন্য RHU এবং RTG-এর প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণেও ইসরো ও পরমাণু শক্তি দপ্তর সহযোগিতা করছে।
মহাকাশে পরিচালন কার্যক্রম ও মানব মহাকাশযাত্রা
মহাকাশে পরিচালন কার্যক্রম বলতে মহাকাশযান কক্ষপথে পৌঁছানোর পর যে কাজগুলি সম্পন্ন করে, সেগুলিকে বোঝায়। এর মধ্যে রয়েছে নিকটবর্তী হওয়া (rendezvous), ডকিং এবং আনডকিং। একটি উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করাই কেবল প্রথম পদক্ষেপ। মহাকাশ স্টেশন, মহাকাশচারীসহ মহাকাশযাত্রা অথবা চাঁদ থেকে নমুনা ফিরিয়ে আনার মতো জটিল অভিযানগুলির সাফল্য নির্ভর করে উৎক্ষেপণের পর মহাকাশযান কি কি কাজ করতে পারে, তার ওপর। অভিন্ন অভিযানের লক্ষ্য পূরণে যখন একাধিক রকেট উৎক্ষেপণের প্রয়োজন হয়, তখন মহাকাশে ডকিং প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। চাঁদ থেকে নমুনা ফিরিয়ে আনা এবং ভারতীয় অন্তরীক্ষ স্টেশন নির্মাণ ও পরিচালনার মতো পরিকল্পনার ভিত্তিও এই প্রযুক্তি।
ইসরোর SpaDeX অভিযানে ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি প্রথমবার দুটি উপগ্রহের ডকিং সম্পন্ন করা হয় এবং পরবর্তীতে আনডকিংও প্রদর্শন করা হয়। ২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল উপগ্রহ দুটির মধ্যে ১৫ মিটার দূরত্ব থেকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে দ্বিতীয়বার ডকিং সম্পন্ন হয়। ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল ডকিং করা উপগ্রহ দুটির মধ্যে দ্বিমুখী বিদ্যুৎ স্থানান্তর প্রদর্শন করা হয়। এর ফলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চিনের পর ভারত মহাকাশে ডকিং প্রযুক্তি প্রদর্শনকারী বিশ্বের চতুর্থ দেশ হয়ে ওঠে। এই সাফল্য ভবিষ্যতের অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির অগ্রগতিতেও সহায়তা করে।
মহাকাশযানকে একত্রিত করার পাশাপাশি, ডকিং-এর মাধ্যমে কক্ষপথে থাকা অবস্থায় সেগুলিকে একসঙ্গে কাজ করানো সম্ভব হয়।
ভবিষ্যতে কক্ষপথে পরিষেবা প্রদানের মাধ্যমে মহাকাশযানকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে না এনেই পুনরায় জ্বালানি ভরা, মেরামত করা অথবা তার উন্নয়ন সাধন করা সম্ভব হতে পারে। SpaDeX অভিযানে ডকিং, আনডকিং এবং বিদ্যুৎ স্থানান্তর প্রদর্শন করা হয়েছে। এই ধরনের কার্যক্রম উপগ্রহের কার্যকাল বাড়াতে পারে এবং বিকল্প উপগ্রহ উৎক্ষেপণের প্রয়োজন কমাতে পারে। ভবিষ্যতে কক্ষপথে পরিষেবা প্রদানের সক্ষমতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই সাফল্যগুলি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
পরবর্তী প্রজন্মের নেভিগেশন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা
উপগ্রহভিত্তিক নেভিগেশন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভারতজুড়ে বিভিন্ন অত্যাবশ্যক পরিষেবাকে সহায়তা করে। নেভিগেশন উপগ্রহ অবস্থান নির্ণয়, পথনির্দেশ এবং সময় সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করে। অন্যদিকে, যোগাযোগ উপগ্রহ টেলিভিশন, টেলিফোন, ব্রডব্যান্ড ও অন্যান্য তথ্য সংকেত প্রেরণ করে। সম্মিলিতভাবে এই ব্যবস্থাগুলি পরিবহণ, আর্থিক পরিষেবা, টেলিযোগাযোগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে সহায়তা করে। ইসরোর দেশীয় নেভিগেশন ব্যবস্থা NavIC এবং যোগাযোগ উপগ্রহের মাধ্যমে ভারত এই সক্ষমতাগুলিকে আরও শক্তিশালী করছে।
নেভিগেশন উইথ ইন্ডিয়ান কনস্টেলেশন (NavIC) হল ভারতের নিজস্ব আঞ্চলিক উপগ্রহভিত্তিক নেভিগেশন ব্যবস্থা, যা ইসরো দ্বারা বিকশিত ও পরিচালিত হয়। এই ব্যবস্থা সমগ্র ভারত এবং মূল ভূখণ্ডের বাইরে ১,৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় অবস্থান নির্ণয়, পথনির্দেশ ও সময় সংক্রান্ত পরিষেবা প্রদান করে। NavIC অসামরিক ব্যবহারকারীদের জন্য স্ট্যান্ডার্ড পোজিশনিং সার্ভিস এবং অনুমোদিত ব্যবহারকারীদের জন্য এনক্রিপ্ট করা রেস্ট্রিক্টেড সার্ভিস প্রদান করে। এই সক্ষমতাগুলি স্থলপথ, আকাশপথ ও সমুদ্রপথে নেভিগেশন, ভূমি জরিপ, যানবাহনের অবস্থান নির্ণয় এবং নির্ভুল সময় নির্ধারণে সহায়তা করে। স্থলভিত্তিক নেটওয়ার্কের আওতার বাইরে মাছ ধরতে যাওয়া মৎস্যজীবীদের জন্য NavIC জরুরি সতর্কবার্তা পাঠানোর ক্ষেত্রেও সহায়তা করে। এই ব্যবস্থাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ যন্ত্র ও অ্যাপ্লিকেশনের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে অসামরিক ও কৌশলগত ক্ষেত্রে এর ব্যবহার আরও বাড়ানো সম্ভব।
এছাড়াও, ভারতের যোগাযোগ উপগ্রহগুলি সম্প্রচার, ব্রডব্যান্ড সংযোগ এবং সুরক্ষিত যোগাযোগ পরিষেবাকে সহায়তা করে। ২০২২ সালের ২৩ জুন ভারতীয় সময় রাত ৩টা ২০ মিনিটে (স্থানীয় সময় অনুযায়ী ২২ জুন) ফরাসি গায়ানার কৌরু থেকে Ariane-5 রকেটের মাধ্যমে GSAT-24 উৎক্ষেপণ করা হয়। ভারতে ডিরেক্ট-টু-হোম (DTH) টেলিভিশন পরিষেবার চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে এই উপগ্রহটি তৈরি করা হয়েছিল। এই সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর GSAT-N2 (GSAT-20) উৎক্ষেপণ করা হয়। এই উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন উপগ্রহটির তথ্য পরিবহণ ক্ষমতা প্রায় ৪৮ জিবিপিএস। প্রত্যন্ত দ্বীপাঞ্চল-সহ ভারতজুড়ে ব্রডব্যান্ড পরিষেবা ও বিমানযাত্রার সময় ইন্টারনেট সংযোগ প্রদানের লক্ষ্যে এটি তৈরি করা হয়েছে।
যোগাযোগ রক্ষাকারী উপগ্রহগুলি ভারতের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত চাহিদাও পূরণ করে। CMS-03, যা GSAT-7R নামেও পরিচিত, ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর উৎক্ষেপণ করা হয়। এটি ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য নির্দিষ্ট একটি যোগাযোগ উপগ্রহ। এই উপগ্রহগুলি মহাকাশভিত্তিক ভারতের যোগাযোগ পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করে এবং অসামরিক সংযোগ, সামুদ্রিক কার্যক্রম ও জাতীয় নিরাপত্তাকে সহায়তা করে।
উন্নত পৃথিবী পর্যবেক্ষণ
উপগ্রহ
পৃথিবী পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ মহাকাশ থেকে স্থলভাগ, মহাসাগর, বরফে আচ্ছাদিত অঞ্চল এবং বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণ করে। এই উপগ্রহগুলির তথ্য কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলসম্পদ পরিকল্পনা, জলবায়ু গবেষণা ও জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সহায়তা করে। ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ইসরো মোট ২২টি উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করেছে, যার মধ্যে সাতটি ছিল পৃথিবী পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ। এই উপগ্রহগুলি প্রাকৃতিক সম্পদ পর্যবেক্ষণ, পরিবেশগত পরিবর্তনের ওপর নজর রাখা এবং তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনায় সহায়তার জন্য ছবি ও তথ্য সরবরাহ করে। রাডার ইমেজিং এবং হাইপারস্পেকট্রাল পর্যবেক্ষণ-সহ উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে ভারত এই সক্ষমতাগুলিকে আরও শক্তিশালী করে চলেছে।
পৃথিবী পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হল নাসা-ইসরো সিন্থেটিক অ্যাপারচার রাডার (NISAR) অভিযান। ২০২৫ সালের ৩০ জুলাই শ্রীহরিকোটা থেকে GSLV-F16 রকেটের মাধ্যমে এটি উৎক্ষেপণ করা হয়। এই প্রথম কোনও উপগ্রহ অভিযানে একসঙ্গে দুটি রাডার ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করা হচ্ছে—নাসার L-ব্যান্ড এবং ইসরোর S-ব্যান্ড। রাডারের মাধ্যমে মেঘের মধ্য দিয়েও এবং অন্ধকারে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব। ফলে, দিন ও রাত—উভয় সময়েই প্রায় সব ধরনের আবহাওয়ায় পর্যবেক্ষণ করা যায়। NISAR-কে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে প্রতি ১২ দিন অন্তর পৃথিবীর স্থলভাগ ও বরফে আচ্ছাদিত পৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণ করা যায়। এর তথ্য বিজ্ঞানীদের ভূমির বিকৃতি, হিমবাহের চলন, উদ্ভিদ আচ্ছাদনের পরিবর্তন, মাটির আর্দ্রতা এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণে সহায়তা করতে পারে। এই পর্যবেক্ষণ উপকূলীয় অঞ্চল পর্যবেক্ষণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলার কাজেও সহায়ক হতে পারে।
রাডার যেখানে পৃথিবীর পৃষ্ঠের পরিবর্তন শনাক্ত করতে সাহায্য করে, সেখানে হাইপারস্পেকট্রাল ইমেজিং বিভিন্ন উপাদান ও পৃষ্ঠের বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করতে সহায়তা করে। ইসরো ২০১৮ সালের ২৯ নভেম্বর হাইপারস্পেকট্রাল ইমেজিং স্যাটেলাইট (HysIS) উৎক্ষেপণ করে। এই উপগ্রহ দৃশ্যমান আলো, নিকট-অবলোহিত এবং স্বল্প-তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অবলোহিত তরঙ্গদৈর্ঘ্যে পৃথিবীর পৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণ করে। আলোর অসংখ্য সংকীর্ণ তরঙ্গদৈর্ঘ্য-পরিসরে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে HysIS এমন বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করতে পারে, যা সাধারণ চিত্রগ্রহণের মাধ্যমে সহজে চিহ্নিত করা সম্ভব নাও হতে পারে। এর তথ্য কৃষি, বনবিদ্যা, মাটি ও ভূতাত্ত্বিক গবেষণা, উপকূলীয় অঞ্চল এবং অভ্যন্তরীণ জলভাগ সংক্রান্ত কাজে ব্যবহৃত হয়।
আপনি কি জানেন?
HysIS-এর সঙ্গে আটটি দেশের ৩০টি বিদেশি উপগ্রহও উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। এগুলির মধ্যে ছিল একটি মাইক্রো-উপগ্রহ এবং ২৯টি ন্যানো-উপগ্রহ। অংশগ্রহণকারী দেশগুলি ছিল অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, কলম্বিয়া, ফিনল্যান্ড, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, স্পেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে ২৩টি উপগ্রহ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। এই উৎক্ষেপণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের জন্য একসঙ্গে একাধিক উপগ্রহ কক্ষপথে স্থাপনের ক্ষেত্রে PSLV-এর সক্ষমতাও প্রদর্শিত হয়।
আগামীর পথ: ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মহাকাশ অর্থনীতি গড়ে তোলা
বৈজ্ঞানিক ও কৌশলগত লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি, ভারতের মহাকাশ ক্ষেত্র ক্রমশ অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং শিল্পক্ষেত্রের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। মহাকাশ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩৩ সালের মধ্যে ভারতের মহাকাশ অর্থনীতির পরিমাণ ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছনোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎক্ষেপণ যান, বায়ু-শ্বাসী প্রপালশন, বৈদ্যুতিক প্রপালশন এবং মহাকাশে ডকিংয়ের মতো উদীয়মান প্রযুক্তি এই বৃদ্ধিকে সহায়তা করছে।
প্রযুক্তিগত অগ্রগতির এই গতি ইতিমধ্যেই অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে। ইসরোর উদ্ভাবিত ৮৩টি প্রযুক্তি ভারতীয় শিল্পক্ষেত্রে হস্তান্তরের জন্য নিউস্পেস ইন্ডিয়া লিমিটেড (NSIL) ১১৮টি প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর ফলে, বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বাড়ছে। ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ভারতের মহাকাশ-সংক্রান্ত স্টার্ট-আপগুলিতে ক্রমপুঞ্জিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৬১৮.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে, অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ের বীজ মূলধন থেকে সরে এসে বৃহত্তর অঙ্কের এবং ব্যবসার বৃদ্ধি-পর্যায়ের বিনিয়োগের দিকে ঝোঁক দেখা যাচ্ছে।
সম্মিলিতভাবে এই অগ্রগতিগুলি দেখায় যে ভারতের উদীয়মান মহাকাশ প্রযুক্তি শুধু দেশের নিজস্ব সক্ষমতাকেই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে না, বরং আগামী বছরগুলির জন্য উদ্যোগভিত্তিক একটি শক্তিশালী মহাকাশ-ভিত্তিক অর্থনীতিও গড়ে তুলছে।
তথ্যবিবরণী
Department of Space
ISRO
Click here to see pdf
*******
SSS/RP.......