প্রধানমন্ত্রীরদপ্তর
গুজরাটের কেভাডিয়াতে সর্দার প্যাটেলের জন্ম শতবার্ষিকীতে একতা দিবস প্যারেড উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ
প্রকাশিত:
06 NOV 2019 6:33PM by PIB Kolkata
নয়াদিল্লি, ৩১ অক্টোবর, ২০১৯
আমি বলবো, সর্দার প্যাটেল – আপনারা সবাই দু’হাত উপরে তুলে সম্পূর্ণ শক্তি দিয়ে বলবেন – অমর রহে, অমর রহে।
সর্দার প্যাটেল – অমর রহে, অমর রহে।
সর্দার প্যাটেল – অমর রহে, অমর রহে।
সর্দার প্যাটেল – অমর রহে, অমর রহে।
বন্ধুগণ, আমরা এখুনি সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের কন্ঠস্বরে তাঁর ভাবনার কথা শুনলেন। প্রতিমুহূর্তে দেশের একতা ও অখণ্ডতা নিয়ে তিনি ভাবতেন। আজ তাঁর উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ, তাঁর বাণী; আজকের প্রেক্ষিতে তাঁর ভাবনার প্রাসঙ্গিকতাকে অনুভব করায় তাঁর বাণীতে যে শক্তি ছিল, তাঁর ভাবনায় যে প্রেরণা ছিল, তা প্রত্যেক ভারতবাসী অনুভব করতে পারে। আজ আমাদের সৌভাগ্য যে, এই বাণী আমরা সর্দার সাহেবের কন্ঠস্বরে তাঁরই সর্বোচ্চ মূর্তির সান্নিধ্যে শুনতে পেয়েছি।
বন্ধুগণ, যেভাবে কোনও শ্রদ্ধাস্থলে এসে অসীম শান্তি পাওয়া যায়, নতুন প্রাণশক্তি সঞ্চারিত হয়, সর্দার সাহেবের কাছে এসে আমার তেমনই অনুভব হচ্ছে। মনে হয় যেন তাঁর মূর্তিরও নিজস্ব ব্যক্তিত্ব রয়েছে, সামর্থ্য ও বার্তা রয়েছে। এই মূর্তি যত বিশাল, যত দূর থেকে দেখা যায় – ততই পবিত্র! দেশের ভিন্ন ভিন্ন প্রান্ত থেকে কৃষকদের দান করা লোহা দিয়ে এই মূর্তিটি তৈরি আর দেশের সমস্ত প্রান্তের মাটি দিয়ে এর ভিত্তিভূমি প্রস্তুত হয়েছে। সেজন্য এই মূর্তি আমাদের দেশের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের জীবন্ত প্রতীক – একটি প্রাণবন্ত বার্তা।
বন্ধুগণ, আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে বিশ্বের এই সর্বোচ্চ মূর্তি দেশকে সমর্পণ করা হয়েছিল। আজ এই মূর্তি শুধু ভারতবাসীকেই নয়, গোটা বিশ্বকে আকর্ষণ করছে, প্রেরণা যোগাচ্ছে। আজ এই প্রেরণা-স্থল থেকে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল’কে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করে গোটা রাষ্ট্র গর্ব অনুভব করছে। কিছুক্ষণ আগে রাষ্ট্রীয় একতার বার্তা পুনঃউচ্চারণের জন্য, ঐক্যমন্ত্রে বাঁচার জন্য ‘রান ফর ইউনিটি’ বা ‘রাষ্ট্রীয় একতা দৌড়’ সম্পন্ন হয়েছে। আমাদের জাতীয় চরিত্রের মধ্যেই একতার বীজ রয়েছে আর এই একতা আমাদের ভবিষ্যৎ স্বপ্নগুলিকে বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে বড় সম্বল; একথা মাথায় রেখেই দেশের সমস্ত প্রান্তে একই সময়ে এই দৌড় - এর আয়োজন করা হয়েছে। সমস্ত গ্রাম ও শহরের আবালবৃদ্ধবনিতা বিপুল উৎসাহে এই দৌড় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছেন। এখানে আজ রাষ্ট্রীয় একতা প্যারেডেরও আয়োজন করা হয়েছে। এই বিশাল আয়োজনে অংশগ্রহণের জন্য আমি প্রত্যেক দেশবাসীকে অভিনন্দন জানাই।
বন্ধুগণ, গোটা বিশ্বে ভিন্ন ভিন্ন দেশ, নানা ধর্ম, ভিন্ন ভিন্ন ভাষার মানুষ এর সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছেন। কিন্তু আমাদের কখনও ভুললে চলবে না যে, বিশ্বের যে কোনও দেশই গড়ে উঠেছে, সেদেশের জনগণের ঐক্যের মাধ্যমে। সেই ঐক্যকে সুনিশ্চিত করতে অনেক দেশকেই পরিকল্পনা-মাফিক এগিয়ে যেতে হয়েছে। ভালো হোক, কিংবা খারাপ, ঠিক হোক কিংবা ভুল - ইতিহাস তার বিচার করে, কিন্তু যথাসম্ভব চেষ্টা করে যেতে হয়।
কিন্তু ভারতের পরিচয় ভিন্ন। ভারতের বৈশিষ্ট্যই হ’ল – বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য হ’ল আমাদের গর্ব, আমাদের গৌরব, আমাদের গরিমা, আমাদের পরিচয়। আমাদের দেশে এই বৈচিত্র্যকে উদযাপন করা হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দীকাল ধরে বৈচিত্র্য আমাদের দেশে কোনও বিরোধ তৈরি করে না, বরং আমরা বৈচিত্র্যের অন্তর্নিহিত ঐক্যের সামর্থ্যকে অনুভব করি।
বৈচিত্র্যের উদযাপন, বৈচিত্র্যের উৎসবের মধ্যে লুক্কায়িত ঐক্যকে স্পর্শ করায় তাকে তুলে ধরে বাঁচার প্রেরণা যোগায়, পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার উদ্দীপনা যোগায়, লক্ষ্যের পাশাপাশি উদ্দেশ্যও জুড়তে থাকে আর গন্তব্যও পার হয়ে যায়।
যখন আমরা দেশের ভিন্ন ভিন্ন ভাষা এবং কয়েকশো কথ্য ভাষা নিয়ে গর্ব করি, তখন শব্দাবলী ভিন্ন হলেও আমরা ভাবের বন্ধনে একসূত্রে বাঁধা পড়ি। যখন আমরা নানা খাদ্যাভাস এবং পোশাক-পরিচ্ছদকে আমাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য বলে মনে করি, তখন অনায়াসে এর মধ্যে আপনত্বের মিষ্টত্ব ভরে যায়। যখন আমরা ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রের উৎসবে সামিল হই, তখন সেই উৎসবের আনন্দ আরও বেড়ে যায় এবং উৎসবটিও নতুন রঙে রঙিন হয়, নতুন সুবাস ছড়াতে থাকে।
আমরা যখন ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যের ঐতিহ্য, বৈশিষ্ট্য, সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যের আনন্দ উপভোগ করি, তখন মনের মধ্যে একটি ভারতীয় ভাব বিকশিত হয়, গৌরব বৃদ্ধি পায়। আমরা যখন বিভিন্ন ধর্ম, সম্প্রদায়, তাঁদের ঐতিহ্য ও আস্থাকে সমানভাবে সম্মান করি, তখন সদ্ভাব ও সৌহার্দ্য অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়। সেজন্য আমাদের প্রতি মুহূর্তে এই বৈচিত্র্যকে উদযাপন করতে হবে, উৎসবের মতো করে পালন করতে হবে, মনে-প্রাণে এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে – এটাই আমাদের স্বপ্নের এক ভারত শ্রেষ্ঠ ভারত, এটাই হ’ল রাষ্ট্র নির্মাণ।
বন্ধুগণ, এই যে শক্তি, তা বিশ্বের আর কোনও দেশের ভাগ্যে জোটেনি। দক্ষিণ ভারত থেকে আদি শঙ্করাচার্য উত্তর ভারতে এসে হিমালয়ের কোলে অনেক মঠ স্থাপন করেছেন। বাংলা থেকে স্বামী বিবেকানন্দ গিয়ে দক্ষিণ ভারতের কন্যাকুমারীতে নতুন জ্ঞান আরোহন করেন। পাটনায় জন্ম গ্রহণকারী গুরু গোবিন্দ সিং পাঞ্জাবে গিয়ে দেশের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে খালসা পন্থা গড়ে তোলেন। রামেশ্বরমে জন্মগ্রহণকারী ডঃ এপিজে আব্দুল কালাম দিল্লিতে দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছিলেন। গুজরাটের পোরবন্দরের মাটিতে জন্ম গ্রহণ করা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী বিহারের চম্পারণে গিয়ে দেশকে জাগিয়ে তোলার কাজ করেছেন। সেজন্য আমি বিশ্বাস করি যে, আমাদের ঐক্যের এই শক্তিকে নিরন্তর উদযাপন করে যাওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
একতার এই শক্তি ভারতীয়ত্বের মূল প্রবাহ এবং গতি। একতার এই শক্তিই সত্যিকরের অর্থে ডঃ বাবাসাহেব আম্বেদকরের নেতৃত্বে রচিত আমাদের সংবিধানের মূল প্রেরণা-স্রোত। ‘আমরা ভারতের জনগণ’ – এই তিন-চারটি শব্দ দিয়ে শুধু আমাদের সংবিধান শুরু হয় না, হাজার হাজার বছর ধরে ভারতীয় ঐক্যের এই ভাবকে শব্দে সাজিয়ে আমাদের চির পুরাতন সাংস্কৃতিক ইতিহাস, পরম্পরা, বিশ্বাসের প্রতিবিম্ব গড়ে তোলে।
বন্ধুগণ, আমি আপনাদের ক্রীড়া জগৎ থেকে একটি উদাহরণ দিচ্ছি। আমরা জানি, যখন গ্রামে কোনও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হয়, তখন উভয় দল জেতার জন্য সমস্ত শক্তি লাগিয়ে দেয়। এক দল হারে আর আরেক দল জেতে! যারা জেতে, তারা তহশীল পর্যায়ে খেলতে যায়। যখন তহশীল পর্যায়ে প্রতিযোগিতা হয়, তখন গ্রামে পরাজিত দলের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়কেও গ্রামের দলটিতে সামিল করা হয় আর গ্রামের সমস্ত মানুষ সেই দলকেই সমর্থন করে। এরকমই আমরা জেলা ও রাজ্য পর্যায়ে নির্বাচিত দলের ক্ষেত্রে দেখি। জাতীয় পর্যায়ে খেলার সময় আমরা প্রত্যেকেই নিজের রাজ্যের খেলোয়াড়দের সমর্থন করি। আবার জাতীয় দল যখন কোনও বিদেশি দলের সঙ্গে খেলে, তখন আমরা প্রত্যেক রাজ্যের মানুষ সেই দলকে সমর্থন করি। ভালো খেলোয়াড় কোন্ রাজ্যের, তাঁর ভাষা কি, তিনি কোন্ ভাষায় কথা বলেন, আমাদের রাজ্য দলকে হারানোর ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা কি ছিল – সেসব বিচার করি না। ভারতের তেরঙ্গা কাঁধে নিয়ে তিনি যখন জয়লাভের পর উদযাপন করেন, তখন তাঁর সঙ্গে সমস্ত ভারতের আবেগ ছুটতে থাকে। ভারতমাতার জয় ঘোষিত হতে থাকে। এটাই হ’ল ঐক্যের আসল শক্তি। বিদেশের মাটিতে মেডেল জেতার পর তেরঙ্গা কাঁধে নিয়ে দৌড়ানো খেলোয়াড়ের জন্য কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, মহারাষ্ট্র থেকে মণিপুর প্রত্যেক ভারতবাসী রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠেন, উদযাপন করেন।
বন্ধুগণ, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল যখন ৫০০-রও বেশি দেশীয় রাজন্যবর্গের শাসনাধীন রাজ্যকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করার ভগীরথসম কাজ করেছিলেন, তাঁর মধ্যে এই ঐক্যের চুম্বক শক্তিই সমস্ত রাজরাজড়াদের তাঁর প্রতি আকর্ষণ করেছে। কয়েকশো বছরের দাসত্বের কালখন্ডেও বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন রকম দাসত্ব ও অন্যান্য সংকট, নানা রকম লোভ থাকা সত্ত্বেও ভারতের প্রায় সমস্ত প্রান্তেই যে ভারতীয়ত্ব হারিয়ে যায়নি, তার প্রমাণ হ’ল সর্দার সাহেবের একতার মন্ত্রে ছত্রছায়ায় একের পর এক সমস্ত রাজরাজড়াদের সামিল হওয়া।
ভাই ও বোনেরা, আমাদের সর্বদা মনে রাখতে হবে যে, অনেক শতাব্দী আগে সমস্ত রাজন্যশাসিত রাজ্যগুলি সহ ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহ্য এবং বৈচিত্র্যকে সমাহিত করে এক ভারতের স্বপ্ন নিয়ে রাষ্ট্র পুনরুদ্ধারের সফল প্রচেষ্টা করেছিলেন আরেকজন মহাপুরুষ। সেই ঐতিহাসিক মহাপুরুষের নাম হ’ল চাণক্য। চাণক্য অনেক শতাব্দী আগে দেশকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। তারপর, আর কেউ যদি একাজে সফল হয়ে থাকেন, তিনি হলেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। অন্যথা, ইংরেজরা চাইছিল যে, স্বাধীনতার পর ভারত ছিন্ন-বিছিন্ন হয়ে যাক। কিন্তু সর্দার প্যাটেল নিজের প্রবল ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে দেশকে একসূত্রে গেঁথে রাষ্ট্র বিরোধী সমস্ত শক্তিকে পরাজিত করেন।
ভাই ও বোনেরা, আজ বিশ্ব মঞ্চে আমাদের প্রভাব এবং সদ্ভাব উভয়ই ক্রমবর্ধমান। আর এর প্রধান কারণ হ’ল আমাদের একতা। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য – এটাই আমাদের পরিচয়। আজ গোটা বিশ্ব ভারতের কথা মনযোগ দিয়ে শোনে। এর কারণ হ’ল – কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, অটক থেকে কটক – এক রাষ্ট্র, শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্র, মহান সংস্কৃতি, মহান পরম্পরা – আর এটাই আমাদের শক্তি।
আজ ভারত বিশ্বের বৃহৎ আর্থিক শক্তিগুলির মধ্যে নিজের স্থান করে নিয়েছে, নিজের অধিকার অর্জন করছে। অর্থ জগতের সমস্ত গতিবিধি, টাকা, ডলার কিংবা পাউন্ডের মাধ্যমে আবর্তিত হয়। কিন্তু এর পেছনে সত্যিকারের শক্তি হ’ল – রাষ্ট্রীয় একতা, দেশবাসীর সংকল্প, সামর্থ্য, পরিশ্রম, সংকল্পকে সিদ্ধ করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাহস। বিশ্ববাসী আমাদের এই বৈচিত্র্যকে দেখে অবাক হন। এই বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যকে তাঁদের কাছে জাদু বলে মনে হয়। কিন্তু প্রত্যেক ভারতবাসীর জন্য এই বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যই হ’ল আমাদের অন্তঃসলিলা জীবনধারা। এই জীবনধারা আদিকাল থেকে অনবরত আমাদের সংস্কার সরিতা হয়ে উঠে আমাদের মনমন্দিরে প্রবাহিত হতে থাকে, আমাদের পুলকিত করতে থাকে, সময়ের সঙ্গে এতে নতুন নতুন মাত্রা যুক্ত হতে থাকে। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মনে এই জীবনধারার প্রতি অটুট ও অখন্ড বিশ্বাস ছিল বলেই তিনি একে মূলমন্ত্র করে তুলেছিলেন।
বন্ধুগণ, একবিংশ শতাব্দীর ভারতে এই ঐক্য ভারত বিরোধীদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রতিস্পর্ধা। আমি আজ রাষ্ট্রীয় একতা দিবসে প্রত্যেক দেশবাসীকে দেশের সামনে উপস্থিত এই চ্যালেঞ্জকে মনে করাতে চাই। অনেকে এসেছে আর বাধা পেয়ে ফিরে গেছে; বড় বড় স্বপ্ন ও উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছিল। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে, ‘হস্তি মিটতি নেহি হামারি!’
ভাই ও বোনেরা, যারা আমাদের সঙ্গে যুদ্ধে জিততে পারে না, তারা আমাদের ঐক্যকে নষ্ট করতে চায়, আমাদের ঐক্যে ছিদ্র সৃষ্টি করার চেষ্টা করে, বিচ্ছিন্নতাবাদ আমাদের ঐক্যকে চ্যালেঞ্জ জানায়। শতাব্দীর পর শতাব্দীকাল ধরে গড়ে ওঠা আমাদের সামর্থ্যরূপী একতাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। কিন্তু তাঁরা ভুলে যায় যে, হাজার হাজার বছর ধরে যারা এই প্রচেষ্টা চালিয়েছে, তারা কেউ-ই সফল হয়নি, আমাদের একতাকে পরাস্ত করতে পারেনি।
আর সেজন্য বন্ধুগণ, যখনই আমাদের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য নিয়ে কোনও কথা হয়, ঐ সমস্ত শক্তি হতাশায় ভোগে। তাদের সমস্ত শক্তি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সেজন্য ১৩০ কোটি ভারতবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থেকে এদের মোকাবিলা করতে হবে। আর এটাই হবে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের প্রতি সত্যিকরের শ্রদ্ধাঞ্জলি। রাষ্ট্রীয় ঐক্যের সমস্ত পরীক্ষায় আমাদের সফল হতে হবে।
ভাই ও বোনেরা, সর্দার সাহেবের আশীর্বাদে কয়েক সপ্তাহ আগে এই শক্তিগুলিকে পরাস্ত করার জন্য দেশ একটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বন্ধুগণ, সংবিধানের ৩৭০ ধারা জম্মু ও কাশ্মীরকে বিচ্ছিন্নতাবাদ আর সন্ত্রাসবাদ ছাড়া আর কিছু দেয়নি। গোটা দেশে জম্মু ও কাশ্মীরই একমাত্র রাজ্য, যেখানে এই ৩৭০ ধারা জারি ছিল, সারা দেশে জম্মু ও কাশ্মীরই একমাত্রা রাজ্য, যেখানে বিগত তিন দশকে সন্ত্রাসবাদের কবলে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু ও হত্যা হয়েছে। অনেক মা তাঁদের সন্তানদের হারিয়েছেন, অনেক বোন তাঁদের ভাইদের হারিয়েছেন, অনেক শিশু মাতৃ ও পিতৃহীন হয়েছে।
বন্ধুগণ, আর কতদিন দেশ নির্দোষ মানুষদের মৃত্যু দেখতে থাকবে। বন্ধুগণ, অনেক দশক ধরে ভারতীয়দের মনে এই ৩৭০ ধারা একটি অস্থায়ী প্রাচীর গড়ে তুলেছিল। আমাদের যে ভাই ও বোনেরা এই অস্থায়ী প্রাচীরের ওপারে থাকতেন, তাঁরাও অসমঞ্জস ছিলেন। যে প্রাচীর কাশ্মীরে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাসবাদকে বানিয়ে তুলেছিল, আজ সর্দার সাহেবের এই সুউচ্চ মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নত করে অত্যন্ত নম্রতার সঙ্গে আমি সর্দার সাহেবকে হিসাব দিচ্ছি - হে সর্দার সাহেব, আপনার যে স্বপ্ন অসম্পূর্ণ ছিল, আজ সেই প্রাচীর ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
ভাই ও বোনেরা, সর্দার প্যাটেল কখনও বলেছিলেন যে, কাশ্মীর সমস্যা তাঁর হাতে থাকলে সেটির সমাধানে এত সময় লাগতো না। তিনি দেশকে সতর্ক করে গিয়েছিলেন যে, জম্মু ও কাশ্মীরকে সম্পূর্ণ রূপে ভারতে বিলীন করে দেওয়াই হ’ল একমাত্র উপায়। আজ তাঁর জন্ম জয়ন্তীতে তাঁর এই সুউচ্চ প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে বিগত ৫ই আগস্ট ভারতের সংসদ সংখ্যাধিক্যের মতে ৩৭০ ধারা বাতিল করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সর্দার সাহেবের চরণে সেই সিদ্ধান্তকে সমর্পণ করছি। আমাদের সকলের সৌভাগ্য যে, সর্দার সাহেবের অসম্পূর্ণ স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার সুযোগ পেয়েছি। অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে বলছি যে, আজ থেকেই জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখ একটি নতুন ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়াচ্ছে।
আমার ভাই ও বোনেরা, আপনারা শুনে অবাক হবেন যে, গত সপ্তাহে জম্মু ও কাশ্মীরে ব্লক ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলের নির্বাচনে ৯৮ শতাংশ পঞ্চায়েত প্রধান ও পঞ্চায়েত সদস্যরা ভোট দিয়েছেন। ৩৭০ ধারার বাহানা দিয়ে এর আগে জম্মু ও কাশ্মীরে এই নির্বাচন হয়নি। গত সপ্তাহের এই গণতান্ত্রিক সাফল্য জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণের ভারতীয় গণতন্ত্রে অংশগ্রহণের আগ্রহের বার্তাবাহী। এই বার্তা দেশের একতার পক্ষে ইতিবাচক। এই সাফল্য আমি সর্দার সাহেবের চরণে অর্পণ করছি।
এখন জম্মু ও কাশ্মীরে রাজনৈতিক স্থিরতা আসবে। এখন ব্যক্তিগত স্বার্থে সরকার গড়া আর ফেলে দেওয়ার খেলা বন্ধ হবে। আঞ্চলিকতার নিরিখে বৈষম্য সৃষ্টি করা আর আরোপ-প্রত্যারোপের খেলা বন্ধ হবে। সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর সত্যিকারের উন্নয়নযাত্রা এখন পায়ে পা মিলিয়ে চলতে শুরু করবে। নতুন সড়কপথ, রেলপথ, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখের জনগণকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
বন্ধুগণ, আগস্ট মাসে আমি জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণকে একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম যে, জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ এবং রাজ্যের অন্যান্য কর্মচারীদের অন্যান্য কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের কর্মচারীদের সমান বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে। আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে, আজ থেকে জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখের সমস্ত কর্মচারীরা সপ্তম বেতন কমিশন স্বীকৃত বেতন ও ভাতা পাবেন।
বন্ধুগণ, আমি অত্যন্ত দায়িত্বের সঙ্গে বলছি যে, জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণের মনে আস্থা গড়ে তুলতে সার্থক প্রয়াস শুরু হয়েছে। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখ নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্যকে আমি পুনঃউচ্চারণ করতে চাই – দেশের একতার উপর প্রতিটি আক্রমণকেই আমরা পরাস্ত করবো, উপযুক্ত জবাব দেব দেশের ঐক্য নষ্ট করার যে কোনও প্রচেষ্টাকে। গণতান্ত্রিক শক্তি এত বড় হয় এবং গণভাবনা এত শক্তিশালী হয় যে ঐক্য বিনষ্টকারীরা এদেশে কখনো টিকতে পারবে না!
বন্ধুগণ, সর্দা সাহেবের প্রেরণা গোটা ভারতকে আবেগমথিত করে, অর্থনৈতিক এবং সাংবিধানিক সংহতিকে জোর দেওয়ার পরম্পরাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এই প্রচেষ্টা ছাড়া একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে ভারতের শক্তির কল্পনাও আমরা করতে পারি না।
ভাই ও বোনেরা, একটা সময় ছিল, যখন উত্তর-পূর্ব ভারত এবং অবশিষ্ট ভারতের মধ্যে অবিশ্বাসের খাদ গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছিল। সেখানকার ভৌগোলিক ও আত্মিক যোগাযোগ ব্যবস্থা উভয় ক্ষেত্রেই বারবার অনেক প্রশ্ন উঠে আসছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। এখন উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতা অবশিষ্ট ভারতের সঙ্গে একাত্মতায় বদলে যাচ্ছে। অনেক দশক পুরনো সমস্যাগুলি এখন সমাধানের পথে এগিয়ে চলেছে। হিংসা এবং নানা প্রতিবন্ধকতার দীর্ঘ অমানিশার পর এখন উত্তর-পূর্ব ভারতে মুক্তির সূর্য উদীয়মান। এটি সম্ভব হয়েছে লাঠির ক্ষমতায় নয়, সাধারণ মানুষের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে। দেশের ঐক্য ও সংহতি রক্ষার অন্যান্য প্রচেষ্টাও একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া আর এটি সমস্ত দেশবাসীর দায়িত্বও বটে।
ভাই ও বোনেরা, এই প্রচেষ্টার একটি প্রতীক হ’ল আধার। এর মাধ্যমে ‘এক জাতি, এক পরিচয়’কে সুনিশ্চিত করতে চেয়েছি। জিএসটি-র মাধ্যমে ‘এক জাতি, এক কর’ ব্যবস্থা, ই-ন্যামের মাধ্যমে ‘এক জাতি, এক কৃষি বাজার’, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের জন্য ‘এক জাতি এক গ্রিড, যাতায়াতের জন্য ‘এক জাতি এক মবিলিটি কার্ড’, ডিজিটাল যোগাযোগের জন্য ‘এক জাতি এক অপ্টিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক’, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য ‘এক জাতি এক রেশন কার্ড’ – এই সবকিছু এক ভারত শ্রেষ্ঠ ভারতের দৃষ্টিভঙ্গীকে মজবুত করার কাজ করছে।
ভাই ও বোনেরা, সর্দার সাহের বলতেন, ভারতের স্থায়িত্বের জন্য উদ্দেশ্যের ঐক্য, লক্ষ্যের ঐক্য এবং প্রচেষ্টার ঐক্যে সমতা থাকা উচিৎ। বিগত বছরগুলিতে আমরা নতুন ভারতে সমান উদ্দেশ্য নিয়ে ভারতের সামগ্রিকতাকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছি। সাধারণ মানুষের জীবনে ন্যূনতম সরকার এবং অধিকতম গণঅংশীদারিত্বের মাধ্যমে ভবিষ্যত-কে উজ্জ্বল করে তোলার চেষ্টা করেছি। আজ দেশবাসী নিজেদের অধিকার সম্পর্কে যেমন সচেতন, তেমনই নিজেদের কর্তব্য সম্পর্কে অধিক সক্রিয় ও সচেতন। পরিচ্ছন্নতা আন্দোলনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব পালনে আপামর ভারতবাসী এগিয়ে এসেছে। আমাদের ফিট ইন্ডিয়া আন্দোলনে আপামর দেশবাসীর অংশগ্রহণ সারা পৃথিবী দেখছে। জল সাশ্রয়কে আজকের নাগরিক রাষ্ট্রীয় কর্তব্য বলে মনে করছেন। আইন-কানুন মেনে চলা এক সময় ছিল মানুষের বাধ্যবাধকতা। কিন্তু আজ মানুষ নিজেদের দায়িত্ব ভেবে আইন-কানুন মেনে চলছেন। এখন প্রত্যেকেই বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় একটি কাপড়ের থলে সঙ্গে রাখেন, যাতে প্লাস্টিক ব্যবহার করতে না হয়।
বন্ধুগণ, আমি সমগ্র দেশকে আহ্বান জানাই, আসুন, আমরা সেই পুরনো মন্ত্রকে মনে করে নিজেদের প্রেরণা যোগাই, সেই মন্ত্রটি হ’ল – ‘সং গচ্ছ ধ্বং, সং বদ – ধ্বং, সং ওহ মনাংসি জানতাম্’।
অর্থাৎ, আমরা সবাই মিলেমিশে একসঙ্গে চলি, এক স্বরে কথা বলি, এক মন নিয়ে এগিয়ে যাই।
বন্ধুগণ, এটিই তো একতার সঠিক পথ, যে পথে এগিয়ে ‘এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত’ – এর সংকল্প বাস্তবায়িত হবে, নতুন ভারত নির্মিত হবে।
অবশেষে, আরেকবার আপনাদের সবাইকে, গোটা দেশকে রাষ্ট্রীয় একতা দিবসের অনেক অনেক শুভেচ্ছা জানাই। সর্দার সাহেবের এই সুউচ্চ মূর্তি কেবলই পর্যটন-স্থল নয়, এটি একটি প্রেরণা-স্থল। আজ সর্দার সাহেবের আত্মা যেখানেই থাকুন না কেন, ঐক্যের যে বীজ তিনি বপণ করেছেন, তা আজ ভারতের প্রত্যেক প্রান্তে ঐক্যের বটবৃক্ষ হয়ে উঠেছে। আর তার ছায়ায় ১৩০ কোটি মানুষের স্বপ্ন অঙ্কুরিত হচ্ছে। এই ঐক্য ভাবনার সামর্থে সমগ্র বিশ্ব আশ্বস্ত হচ্ছে, একটি নতুন বিশ্বাস জন্ম নিচ্ছে। সর্দার সাহেবের বপণ করা সেই বীজ আমাদের পরিশ্রম, সংকল্প এবং স্বপ্ন দিয়ে সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে, জনকল্যাণ থেকে জগৎ কল্যাণের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
আমার পক্ষ থেকে আরেকবার ভারতবাসী ও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে নত মস্তকে সর্দার সাহেবের জন্ম জয়ন্তীতে সাদর শ্রদ্ধাঙজলি জানাই। আপনাদের সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনারা সবাই দু’হাত উপরে তুলে সম্পূর্ণ শক্তি দিয়ে আমার সঙ্গে বলুন –
ভারতমাতা কি - জয়!
ভারতমাতা কি - জয়!
ভারতমাতা কি - জয়!
অনেক অনেক ধন্যবাদ।
CG/SB/SB
(রিলিজ আইডি: 1590654)
ভিজিটরের কাউন্টার : 196