মানবসম্পদবিকাশমন্ত্রক
প্রাচীন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কি ভারতের সামুদ্রিক বাণিজ্যকে অতীতে প্রভাবিত করেছিল? এলিফ্যান্টার অতীত অনুসন্ধান করতে চলেছে আইআইটি খড়গপুর
এলিফ্যান্টা দ্বীপের সামুদ্রিক অতীত সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে হাত মেলাল আইআইটি খড়গপুর, মুম্বই পোর্ট অথরিটি এবং প্রত্নতাত্ত্বিক সমীক্ষা সংস্থা
প্রকাশিত:
02 SEP 2026 3:20PM by PIB Kolkata
কলকাতা, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি খড়গপুর (আইআইটি খড়গপুর) ও মুম্বই পোর্ট অথরিটি (MbPA), দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক সমীক্ষা সংস্থা (ASI)-র সঙ্গে সহযোগিতায় এক ও আন্তঃবিষয়ক গবেষণা প্রকল্প শুরু করেছে।
অতীতের জলবায়ু এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তনগুলি এলিফ্যান্টা দ্বীপ ও ভারতের পশ্চিম উপকূলের চারপাশে সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং মানব কার্যকলাপকে কীভাবে প্রভাবিত করেছিল, তা অনুসন্ধান করাই এই প্রকল্পের লক্ষ্য।
প্রারম্ভিক ঐতিহাসিক কাল থেকে মধ্যযুগীয় সময়কাল পর্যন্ত অতীতের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, জলবায়ু পরিস্থিতি এবং সামুদ্রিক কার্যকলাপ পুনর্নির্মাণ করতে এই প্রকল্পটিতে উন্নত ভূ-বিজ্ঞান কৌশল এবং প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ একত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে। মুম্বই পোর্ট অথরিটি এই প্রকল্পের জন্য ১ কোটি টাকা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি প্যানেল (IPCC) পূর্বাভাস দিয়েছে যে, ২১০০ সালের শেষের দিকে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ০.৪ থেকে ০.৮ মিটার বৃদ্ধি পেতে পারে। ভারতের পশ্চিম উপকূলের ক্ষেত্রে, এই বৃদ্ধি ১ মিটার পর্যন্ত হতে পারে, যা কেবল মুম্বাইয়ের সমস্ত নিচু এলাকাকেই নিমজ্জিত করবে না, বরং এলিফ্যান্টা দ্বীপের চারপাশের এলাকাগুলিকেও নিমজ্জিত করবে, যেখানে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ১৫০০ বছরের পুরনো ভগবান শিবের বিখ্যাত শিলা কেটে তৈরি গুহাগুলি রয়েছে। বর্তমানে দ্বীপে কেবল ছোট নৌকার মাধ্যমেই পৌঁছানো যায়, কারণ জলের গভীরতা কমে ৫ মিটারে নেমে এসেছে, যা বড় জাহাজের চলাচলের অনুপযোগী। কিন্তু কল্পনা করুন যে প্রাচীন অতীতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যথেষ্ট বেশি ছিল, তবে কি এলিফ্যান্টার চারপাশে বড় জাহাজ নোঙর করা সম্ভব হতে পারত যেমনটি আজ মুম্বাই বন্দরে করা হয়?
আইআইটি খড়গপুর এবং মুম্বই পোর্ট অথরিটি (MbPA) যৌথভাবে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ASI)-র সঙ্গে সহযোগিতায় ঠিক এই প্রশ্নটিই অনুসন্ধান করছে। এই প্রকল্পটি প্রারম্ভিক ঐতিহাসিক থেকে মধ্যযুগীয় সময়কাল অর্থাৎ, বর্তমানের ১৫০০-১০০০ বছর পূর্ব পর্যন্ত সামুদ্রিক বাণিজ্য কার্যকলাপের ওপর জলবায়ু পরিবর্তন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করবে, যা চলমান জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপর ভবিষ্যৎ প্রভাবের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। মুম্বই পোর্ট অথরিটি এই প্রকল্পের জন্য এক কোটি টাকা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার ড. অভিজিৎ আম্বেকারের নেতৃত্বে সাম্প্রতিক খননকার্যে এলিফ্যান্টা দ্বীপের এযাবৎ অজানা ইতিহাস সামনে এসেছে, যা অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এটি দ্বীপটির ইতিহাসকে শিলা কেটে তৈরি গুহাগুলির থেকেও অতীতে নিয়ে যায়। গভীর খননকার্যে একটি বিশালাকার ১৬৫ বর্গ মিটার এবং ৮ মিটার গভীর আয়তক্ষেত্রাকার জলাধারের কাঠামো পাওয়া গিয়েছে, যা একটি উল্লম্ব সিঁড়ি যুক্ত (টি-আকৃতির ধাপে ধাপে তৈরি ট্যাঙ্ক) বা নিয়মিত ব্যবহারের জন্য একটি প্রাচীন ধাপযুক্ত কুয়ো বা বাউলি, যা এই মহাসাগরীয় দ্বীপে আজও দুর্লভ মিষ্টি জল সঞ্চয়ের কাজে ব্যবহৃত হতো। এই তথ্যগুলি ইঙ্গিত দেয় যে, ১৫০০ বছর আগে এই দুর্গম দ্বীপে জনজীবন বেশ মুখরিত ছিল।
আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার ড. অভিজিৎ আম্বেকার বলেন, “এলিফ্যান্টা দ্বীপের মোরাবন্দরে আমাদের খননকার্যে বিশালাকার সঞ্চয় পাত্র, ইন্দো-মেডিটেরেনিয়ান (রোমান) অ্যামফোরা খণ্ড, টার্কোয়েজ গ্লেজড ওয়্যার, মেসোপটেমীয় টর্পেডো জার পাওয়া গিয়েছে।
ভূমধ্যসাগরীয় অ্যামফোরা জারগুলি সাধারণত মদ ও তেল সহ তরল পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হতো। এই খননকার্য চলাকালীন নিমজ্জিত জেটি বা ঘাট, জোয়ার-ভাটার মধ্যবর্তী স্থানে বাসস্থানের ধ্বংসাবশেষ এবং বন্দরের স্থাপনায় একাধিক জলের চিহ্ন স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, এলিফ্যান্টা কোনো বিচ্ছিন্ন ধর্মীয় স্থান ছিল না, বরং সামুদ্রিক চলাচলের বৃহত্তর ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিত ছিল।”
আইআইটি খড়গপুরের জিওলজি অ্যান্ড জিওফিজিক্স বিভাগের অধ্যাপক এবং প্রকল্পের প্রধান গবেষক মেলিন্ডা বেরা বলেছেন, “এই বসতির উপস্থিতি, আমদানি করা রোমান এবং পশ্চিম এশীয় শিল্পকর্মের বিপুল উদ্ধার, এলিফ্যান্টায় বৃহৎ পরিসরে নোঙর করার ব্যবস্থা বা পণ্য স্থানান্তরের কার্যকলাপ ইঙ্গিত দেয় যে দ্বীপের চারপাশে বড় জাহাজের চলাচল ছিল। আমরা আইআইটি খড়গপুরে উপলব্ধ আধুনিকতম বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে অতীতের জলবায়ু এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পুনর্নির্মাণ করতে চাই। উপকূলীয় নিচু খাঁড়ি দ্বারা বেষ্টিত দুটি পাহাড় সমৃদ্ধ আধুনিক ভূখণ্ড সামান্য সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তনের প্রতিও অত্যন্ত সংবেদনশীল। অপর্যাপ্ত ভূতাত্ত্বিক রেকর্ডগুলি বিগত ৫০০০ বছরে পশ্চিম উপকূল বরাবর ৫ মিটার মানের ওঠানামার ইঙ্গিত দেয়। আমরা এলিফ্যান্টা এবং পশ্চিম উপকূলের অন্যান্য অংশের চারপাশে বেশ কয়েকটি কোর ড্রিল করতে চাই এবং অতীতে জলবায়ু ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা উভয় পুনর্নির্মাণের জন্য রেডিওকার্বন ডেটিং, পলির উৎস এবং অক্সিজেন, কার্বন ও নাইট্রোজেন আইসোটোপের জন্য পলি অধ্যয়ন করতে চাই।”
সহ-গবেষক এবং রেডিওজেনিক আইসোটোপ গবেষণার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ভি. রবিকান্ত বলেছেন, “আমরা প্রত্নতাত্ত্বিক মাটির পাত্র এবং জারগুলির স্ট্রনশিয়াম এবং নিওডিমিয়াম আইসোটোপ বিশ্লেষণ করব, কারণ, সেগুলি এই পাত্র এবং জারগুলি তৈরির জন্য ব্যবহৃত মাটির সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করতে পারে।”
আইআইটি খড়গপুরের ন্যাশনাল স্টেবল আইসোটোপ ফেসিলিটির প্রধান এবং প্রকল্পের উপদেষ্টা অধ্যাপক অনিন্দ্য সরকার বলেন, “মিশরীয় এবং মেসোপটেমীয় সাম্রাজ্যের সঙ্গে ভারতীয় সামুদ্রিক বাণিজ্যের ইতিহাস সিন্ধু সভ্যতা যতটা পুরনো (~৫৫০০ বছর) ততটাই প্রাচীন, যা প্রারম্ভিক ঐতিহাসিক সময়কাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল এবং গুজরাটের ২৮০০ বছরের পুরনো প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ভাদনগরে আমাদের গবেষণায় পাওয়া গিয়েছে। প্রথম শতকের গ্রীক নাবিকের পাণ্ডুলিপি ‘পেরিপ্লাস অফ দ্য ইরিথ্রিয়ান সি’ অনুযায়ী প্রারম্ভিক মধ্যযুগীয় সময়েও পশ্চিম উপকূলের ভরুচ, নালা সোপারা এবং চৌলে একাধিক সক্রিয় বন্দর এবং বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল। এর মধ্যে নালা সোপারা ৫ম শতাব্দী নাগাদ ধ্বংস হয়ে যায় এবং এলিফ্যান্টায় বাণিজ্যের বিকাশ ঘটে। জলবায়ু এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তনের এই সামাজিক-অর্থনৈতিক গতিশীলতার ওপর কোনো প্রভাব ছিল কিনা তা দেখা হবে। আমাদের আগের আইসোটোপ-ভিত্তিক গবেষণাগুলি প্রাচীন মানব বসতি এবং পরিযানের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের গভীর প্রভাব নির্দেশ করেছিল।”
আইআইটি গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত এবং বর্তমানে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত প্রাচীন বাণিজ্যের বিশেষজ্ঞ ও গবেষণা বিজ্ঞানী অজয় যাদব বলেন, “প্রকৃতপক্ষে, এলিফ্যান্টা ভারতের প্রাচীন সামুদ্রিক বাণিজ্য বৈজ্ঞানিকভাবে অধ্যয়নের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।”
এই আন্তঃবিষয়ক উদ্যোগটি পরিবেশগত পরিবর্তন, উপকূলীয় ভূগোল, প্রাচীন বসতি এবং সামুদ্রিক নেটওয়ার্কের মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়ে নতুন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করবে বলে আশা করা হচ্ছে। আইআইটি খড়গপুরের আইসোটোপ জিও-কেমিস্ট্রি, পলি অধ্যয়ন, রেডিওকার্বন ডেটিং এবং পেলিওক্লাইমেট পুনর্নির্মাণের ক্ষমতার সঙ্গে প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলিকে যুক্ত করে, এই প্রকল্পটি অতীতে উপকূলীয় ব্যবস্থাগুলি সমুদ্রপৃষ্ঠের তারতম্যের প্রতি কিভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল সে সম্পর্কে একটি গভীর ধারণা তৈরি করতে চায়—যা বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেও প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

_20260902163719_e17b0d.jpeg)
*******
SSS/PK/Kol/2.9.26...
(রিলিজ আইডি: 2305939)
ভিজিটরের কাউন্টার : 16