প্রধানমন্ত্রীরদপ্তর
ইসরো কন্ট্রোল সেন্টার থেকে জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ
প্রকাশিত:
11 SEP 2019 4:36PM by PIB Kolkata
নয়াদিল্লি, ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
ভারতমাতার জয়, ভারতমাতার জয়, ভারতমাতার জয়।
আপনারা সেই মানুষ, যাঁরা ভারতমাতার জন্য, তাঁকে জেতানোর জন্য বাঁচেন, তাঁকে জেতানোর জন্য লড়াই করেন, যাঁরা ভারতমাতার মাথা উঁচু রাখার জন্যে সারাজীবন উৎসর্গ করেন, নিজেদের স্বপ্নকে সমাহিত করে দেন।
বন্ধুগণ, গত রাতে আপনাদের মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছিলাম, আপনাদের চোখ অনেক কিছু বলছিল, আপনাদের চেহারার মনের কষ্ট ফুটে উঠছিলো, আর সেজন্যেই আমি বেশিক্ষণ আপনাদের মধ্যে থাকিনি। অনেক রাত ধরে আপনারা ঘুমাননি, তবু আমার মন চাইছিলো যে, আপনাদের সঙ্গে কথা বলি। এই মিশনের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি এক ভিন্ন মানসিক অবস্থার শিকার হয়েছিলেন। অনেক প্রশ্ন ছিলো। অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, আর হঠাৎ-ই সমস্ত কিছু দৃষ্টির অন্তরালে চলে যায়। আমিও আপনাদের সঙ্গে থেকে সেই মুহূর্তগুলি অনুভব করেছি। যখন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, আপনারা সবাই কেঁপে উঠেছিলেন। আমি দেখছিলাম, সকলের মনেই স্বাভাবিক প্রশ্ন জেগে উঠেছিল, কেন হল, কিভাবে হল, কারণ বৈজ্ঞানিক মনে সবকিছুই তো কেন আর কেন দিয়ে শুরু হয়। অনেক আশা ছিল। আমি দেখছিলাম যে এর পরেও আপনাদের মনে হচ্ছিলো, আরে ভাই, কিছু তো হবে, কারণ এর পেছনে আপনাদের পরিশ্রম ছিল, প্রতি মুহূর্তে আপনারা তিল তিল করে এটিকে গড়ে তুলেছেন যে!
বন্ধুগণ,
আজ যদিও কিছু বিপত্তি এসেছে, কিন্তু বিপত্তি সত্ত্বেও আমাদের উৎসাহে ভাটা পড়েনি, আরও মজবুত হয়েছে। আজ আমাদের পথে শেষ মুহূর্তে কিছু বিপত্তি এসেছে, কিন্তু আমাদের লক্ষ্য, পথভ্রষ্ট হয়নি। আজ যদিও পরিকল্পনা অনুসারে আমরা চন্দ্রযানকে চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ করাতে পারিনি, কিন্তু যদি কোনও কবি কিম্বা সাহিত্যিককে আজকের ঘটনা নিয়ে লিখতে বলা হয়, তিনি কী লিখবেন? কিন্তু বিজ্ঞানের ভাবনা, বিজ্ঞানের ভাষা ভিন্ন। কিন্তু যদি কোনও কবি কিম্বা সাহিত্যিককে আজকের ঘটনা নিয়ে লিখতে বলা হয়, তিনি অবশ্যই লিখবেন যে, আমরা জীবনে চাঁদের এত এত রোমান্টিক বর্ণনা লিখেছি যে চন্দ্রযানের স্বভাবেও পরিবর্তন এসে গিয়েছিল। শেষ মুহূর্তে চন্দ্রকে স্পর্শ করতে ছুটে গিয়েছিল। কবি এভাবেই বলবেন, আজ আমাদের চাঁদকে স্পর্শ করার ইচ্ছাশক্তি এবং সংকল্প আরও প্রবল হয়েছে, আরও মজবুত হয়েছে, দৃঢ় হয়েছে।
ভারতের ভাই ও বোনেরা, আমার বিজ্ঞানী বন্ধুরা, বিগত কয়েক ঘন্টা ধরে সমগ্র জাতি জেগে ছিল। আমাদের বিজ্ঞানীরা, যাঁরা অন্যতম উচ্চাভিলাষী মিশন, আমাদের চন্দ্রাভিযান শুরু করেছিলেন তাঁদের সঙ্গে সমগ্র জাতির একাত্মতা বজায় ছিল।
আমরা খুব কাছাকাছি গিয়েছি, তবে আমাদের ভবিষ্যতে আরও খুঁটিনাটি প্রস্তুতি নিয়ে এগুতে হবে। আপনাদের প্রতি প্রত্যেক ভারতবাসীর মনে গর্বের পাশাপাশি পরিপূর্ণ আস্থা রয়েছে। আমরা আমাদের মহাকাশ অভিযান এবং বিজ্ঞানীদের জন্য গর্বিত। তাঁদের কঠোর পরিশ্রম এবং দৃঢ়সংকল্প কেবল শুধু ভারত নয়, আরও অনেক দেশের মানুষের উন্নত জীবন সুনিশ্চিত করেছে।
তাঁদের উদ্ভাবনী উচ্চাকাংখার ফলস্বরূপ অসংখ্য মানুষ উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার সুযোগ-সুবিধাসহ জীবনের আরও নানা ক্ষেত্রে উন্নত মানের বিভিন্ন পরিষেবা পাচ্ছেন। ভারতবাসী নিশ্চিত যে, ভবিষ্যতে এরকম আরও অনেক অনেক গর্বিত ও আনন্দিত হওয়ার সুযোগ আসবে, ধন্যবাদ।
একই সাথে, আমরা আত্মবিশ্বাসে পূর্ণ যে আমাদের দেশের শ্রেষ্ঠ মহাকাশ কর্মসূচী এখনও আসেনি। আবিষ্কারের জন্য নতুন নতুন দিগন্ত রয়েছে এবং যাওয়ার জন্য নতুন নতুন জায়গা রয়েছে। সেই সময়গুলিতে সাফল্যের নতুন উচ্চতাকে উদযাপন করতে আমরা জেগে উঠব।
আমি আমাদের বিজ্ঞানীদের বলতে চাই যে, ভারত আপনাদের সাথে রয়েছে। আপনারা ব্যতিক্রমী, দেশের উন্নয়নে আপনাদের অবিশ্বাস্য অবদান অনস্বীকার্য।
আপনারা সর্বদা নিজেদের সেরাটাই দিয়ে এসেছেন এবং ভবিষ্যতে আমাদের আরও অনেক কিছু দেবেন। আপনারা মাখনে দাগ না কেটে পাথরে দাগ কাটবেন।
আপনারা যতটা সম্ভব কাছাকাছি গিয়েছেন। এভাবেই লক্ষ্য স্থির রেখে এগিয়ে যান। আমি নিশ্চিত যে, যেখানে আগে কেউ কোনও দিন যায়নি, যা আগে কেউ কখনও করেনি আপনারা তাই করে দেখাবেন। আমি আপনাদের পরিবারের সদস্যদেরকেও স্যালুট জানাই। তাদের নীরব কিন্তু মূল্যবান সমর্থনের গুরুত্ব অপরিসীম।
ভারতের ভাই ও বোনেরা, স্থিতিশীলতা এবং জেদই ভারতের নীতিবোধের কেন্দ্রীয় সুর। আমাদের হাজার হাজার বছরের গৌরবময় ইতিহাসে আমরা বারবার এমন সব মুহুর্তের সম্মুখীন হয়েছি যা আমাদের গতিকে মন্থর করেছে কিন্তু তা কখনও আমাদের প্রাণশক্তিকে নষ্ট করতে পারেনি। আমরা আবার শক্তি সঞ্চয় করে নানা অবিস্মরণীয় কীর্তি স্থাপন করতে পেরেছি। এজন্যেই আমাদের সভ্যতা দীর্ঘজীবী।
আমার প্রিয় বন্ধুরা, চূড়ান্ত ফলাফল যতটা গুরুত্বপূর্ণ, প্রচেষ্টা এবং সফরও ততটাই। আমি গর্বের সাথে বলতে পারি যে, এক্ষেত্রে প্রচেষ্টা এবং সফর দুটোই ছিল মূল্যবান। আমাদের দল কঠোর পরিশ্রম করেছে, অনেক দূর সফর করেছে এবং এই শিক্ষাগুলি সর্বদা আমাদের সঙ্গে থাকবে। আমরা এই প্রচেষ্টা ও সফরের দিকে পরম সন্তুষ্টি নিয়ে ফিরে তাকাবো এবং এই শিক্ষা আজ থেকে আমাদের আরও শক্তিশালী করে গড়ে তুলবে। আগামীকাল একটি নতুন এবং উজ্জ্বলতর ভোর হবে।
বন্ধুগণ, পরিণাম থেকে নিরাশ না হয়ে, আমাদের নিরন্তর লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পরম্পরাও রয়েছে, আদর্শও রয়েছে। আমাদের হাজার হাজার বছরের ইতিহাস এ ধরণের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। আর প্রারম্ভিক নানা বিপত্তি থাকা সত্ত্বেও আমরা নানা ঐতিহাসিক সাফল্য পেয়েছি।
খোদ ইসরো-ই কখনও হার না মানা সংস্কৃতির জলজ্যান্ত উদাহরণ। প্রারম্ভিক বিপত্তি আর সমস্যাগুলির কাছে হেরে গেলে আজ ইসরো বিশ্বের অগ্রণী মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রগুলির অন্যতম হয়ে উঠতো না!
বন্ধুগণ, পরিণাম নিজের জায়গায়, কিন্তু আমি এবং গোটা দেশ নিজেদের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিবিদদের সমস্ত প্রচেষ্টার জন্য গর্বিত। আমি আপনাদের রাতেও একথা বলেছিলাম, এখন আবার বলছি যে, আমি আপনাদের সঙ্গে রয়েছি, দেশও আপনাদের সঙ্গে রয়েছে।
বন্ধুগণ, প্রত্যেক সমস্যা, প্রত্যেক সংঘর্ষ, প্রত্যেক বিপত্তি আমাদের নতুন কিছু শিখিয়ে যায়। কিছু নতুন আবিষ্কার, নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কারের প্রেরণা জোগায়। আর এর মাধ্যমেই আমাদের পরবর্তী সাফল্য নির্ধারিত হয়। আমি মনে করি যে, জ্ঞানের যদি কোনও বড় শিক্ষক থাকে, তা হল বিজ্ঞান। বিজ্ঞানে বিফলতা বলে কিছু হয় না; শুধু থাকে প্রয়োগ ও প্রচেষ্টা। প্রত্যেক প্রয়োগ, প্রত্যেক প্রচেষ্টা জ্ঞানের নতুন বীজ বপন করে যায় আর আমাদের নিজেদের অসীম সামর্থ্যের অনুভব করায়।
বন্ধুগণ, চন্দ্রযান সফরের শেষ পর্যায়টি আশাপ্রদ না হলেও আমাদের মনে রাখতে হবে যে, চন্দ্রযানের যাত্রা ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত। এই গোটা অভিযানে দেশ অনেকবার আনন্দিত হয়েছে। এই মুহূর্তেও আমাদের অরবিটার গর্বের সঙ্গে চাঁদকে প্রদক্ষিণ করে যাচ্ছে। আমি নিজেও এই অভিযানের সময় দেশে কিম্বা বিদেশে যেখানেই থাকি না কেন, প্রতিনিয়ত চন্দ্রযানের গতিপ্রকৃতির খবর নিতাম।
ভারত বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ শক্তিগুলির মধ্যে অন্যতম, আর তার পেছনে রয়েছে আপনাদের সকলের অবদান, দশকের পর দশক ধরে যারা ইসরোতে কাজ করছেন, তাঁদের সকলের পরিশ্রম ও অবদান। এই আপনারাই প্রথম প্রচেষ্টায় মঙ্গলগ্রহে ভারতের তেরঙ্গা পতাকা উড়িয়েছিলেন। এর আগে বিশ্বে আর কোন দেশ এমন প্রথম অভিযানেই সফলভাবে মঙ্গল জয় করতে পারেনি। আমাদের চন্দ্রযানই প্রথমবার বিশ্ববাসীকে চাঁদে জল থাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। এটাও আপনাদেরই প্রচেষ্টার ফল যে আমরা একসঙ্গে একশোটিরও বেশি উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে রেকর্ড স্থাপন করেছেন। ইসরোর কাছে এমন সাফল্যের দীর্ঘ তালিকা রয়েছে, তাই বিপত্তির দু-একটি মুহূর্তের জন্যে আপনাদের উড়ান কক্ষপথের বাইরে চলে যেতে পারে না।
আমাদের আদর্শ, আমাদের দর্শন, আমাদের ভাবনাচিন্তায় রয়েছে আমাদের বিশ্বাস যে, ‘বয়ম অমৃতস্য পুত্রঃ’। আমরা অমৃতের সন্তান, যাঁদের সঙ্গে অমৃতের সম্পর্ক রয়েছে। অমৃতের সন্তানদের জন্যে কোনও বিপত্তি কিংবা নিরাশার স্থান নেই। আমরা পেছন ফিরে নিরাশ হবো না। আমাদের অসাফল্য থেকে শিক্ষা নিতে হবে, শিখতে হবে, সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে, আর লক্ষ্যে পৌছনোর আগে থামলে চলবে না। আমরা নিশ্চিতভাবেই সফল হবো, আমরা পরবর্তী অভিযানের প্রচেষ্টায় এবং তারপরও প্রত্যেক অভিযানে সফল হবো।
একবিংশ শতাব্দীতে ভারতের স্বপন ও আকাঙ্খাগুলি বাস্তবায়িত করতে আমাদের কোনও ক্ষণিক বাঁধা থামিয়ে রাখতে পারবে না! আপনাদের সবাইকে আগামী সমস্ত অভিযানের জন্যে অনেক অনেক শুভেচ্ছা জানাই। আর আমি আগেও বলেছি, বিজ্ঞান কখনও পরিণাম থেকে সন্তুষ্ট হয় না। বিজ্ঞানের অন্তর্নিহিত গুণ হল প্রচেষ্টা, প্রচেষ্টা আর প্রচেষ্টা। বিজ্ঞান পরিণাম থেকেও নতুন প্রচেষ্টার সুযোগ খোঁজে, কোনও পরিণামে থেমে যায় না। বিজ্ঞান পরিণামের সামনে ঝোঁকেও না, আর এটাই আপনাদের আদর্শ। আর সেজন্যেই দেশ আপনাদের নিয়ে গর্ব করে। আপনাদের উপর আমার আস্থা আছে, আমার থেকেও আপনাদের স্বপ্ন অনেক উঁচু। আমার থেকে আপনাদের সংকল্প আরও গভীর। আমার থেকেও আপনাদের প্রচেষ্টা অনেক বেশি সাফল্যের কপাল চুম্বনের সামর্থ্য রাখে। আর সেজন্যে আমি সম্পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে আপনাদের দৃঢ়সংকল্পে ভরসা রাখি .... আসলে আমি আপনাদের উপদেশ দিতে আসি নি। আপনাদের কাছ থেকে প্রেরণা পেতে আমি সকাল সকাল আপনাদের কাছে এসেছি। আপনারা নিজেরাই প্রেরণার সমুদ্র, একেকজন প্রেরণার জীবন্ত স্বরূপ। আর সেজন্যে এটি আমার জন্যে প্রেরণার মুহূর্ত, যেখানে নিরাশাকে বৈজ্ঞানিক মন আশায় রূপান্তরিত করতে পারে, যেখানে স্বপ্নকে বৈজ্ঞানিক মন সাফল্যে রূপান্তরিত করতে পারে। আর সেজন্যে এমন সামর্থ্যবান, প্রাণশক্তিতে ভরপুর, সংকল্পকে সিদ্ধিতে রূপান্তরিত করতে সমর্পিত এই বন্ধুদের অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই, অনেক অনেক শুভেচ্ছাও জানাই।
অনেক অনেক ধন্যবাদ।
ভারতমাতার জয়, ভারতমাতার জয়, ভারতমাতার জয়,
অনেক অনেক ধন্যবাদ।
CG/SB/SB
(রিলিজ আইডি: 1584731)
ভিজিটরের কাউন্টার : 165